ব্লিঙ্কেনের চীন সফর

সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার পথ খুঁজছে ওয়াশিংটন-বেইজিং

আমেরিকা বিশ্বের এক নম্বর অর্থনীতির দেশ। আর চীন দ্বিতীয়। সামরিক শক্তিতেও দেশ দুটির অবস্থান প্রায় কাছাকাছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমেরিকার অবস্থান অনেক বেশি পোক্ত। কিন্তু খাত দুটিতে অল্প সময়ে চীন যা করছে, তা বিস্ময়কর। ফলে দেশ দুটি প্রায় সমকক্ষ হয়ে উঠছে।

বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারের সব উপাদানে ওয়াশিংটন-বেইজিং প্রায় সমান। তাই স্বাভাবিকভাবে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। এমনকি তা সংঘাতে রূপ নিতে পারে, এমন শঙ্কার অনেক উপলক্ষ তৈরি হয়েছে সম্প্রতি। এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের তিন দিনের চীন সফর কিছুটা ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে।

সফরের প্রথম দিন গত বুধবার এক প্রতিনিধি দল নিয়ে সাংহাইয়ে পৌঁছান ব্লিঙ্কেন। সেখানে চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তিনি। এ ছাড়া আমেরিকান ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়ী নেতাদেরও একাধিক বৈঠক হয়েছে।

সাংহইয়ে পৌঁছানোর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক সংক্ষিপ্ত ভিডিও বার্তায় ব্লিঙ্কেন বলেন, ‘মুখোমুখি বসে কূটনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার কোনো বিকল্প নেই। ভুল হিসাব-নিকাশ এবং পরস্পরের বিষয়ে ভুল ধারণা এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন জনগণের স্বার্থ এগিয়ে নেওয়া এ সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।’

বুধ ও বৃহস্পতিবার সাংহাইয়ে কাটানোর পর আজ শুক্রবার সকালে রাজধানী বেইজিংয়ে যান মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্লিঙ্কেন। সেখানে তিনি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করেন। 

প্রাথমিক বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুটা অভিযোগের সুরে বলেন, ‘চীন-আমেরিকা সম্পর্কের দৈত্যকার জাহাজ কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছ। কিন্তু আমাদের সম্পর্কে নেতিবাচক বিষয় এখনো বিকাশ ও বিস্তার লাভ করছে। আমাদের সম্পর্ক নানা বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। চীনের ন্যায্য উন্নয়নের অধিকারকে অযৌক্তিকভাবে দমন করা হয়েছে এবং আমাদের মূল স্বার্থগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।’

জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য ‘‘সক্রিয় কূটনীতির’’ কোনো বিকল্প নেই। গত নভেম্বরে সানফ্রান্সিসকোতে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও শি জিনপিং বৈঠকে যেসব এজেন্ডা ঠিক করেছেন, আমাদের সেগুলো নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। মতানৈক্যের বিষয়গুলো আমাদের কাছে যতটা সম্ভব পরিষ্কার।’

এরপর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক হয় অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের। বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি বলেন, আমেরিকার এমন আত্মবিশ্বাসী, উদার ও অগ্রগতি সম্পন্ন আচরণে মুগ্ধ চীন। আমরা আশা করি, আমেরিকা চীনের উন্নয়নকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখবে। এতে করে বেইজিং-ওয়াশিংটন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সত্যিকার অর্থে স্থিতিশীল ও উন্নত হবে এবং সামনে অগ্রসর হবে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন ও চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। ছবি: রয়টার্সসফরে যেসব আলোচনা প্রাধান্য পাওয়ার কথা
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের চীন সফরে বেশ কয়েকটি বিষয় আলোচনায় প্রাধান্য পাওয়ার কথা। এর মধ্যে ফেন্টানাইল, রাশিয়া, তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য ইস্যু অন্যতম।

ফেন্টানাইল
ফেন্টানাইল বিষয়ে সাংহাইতেই কথা বলেছেন ব্লিঙ্কেন। সেখানে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘চীনের বিভিন্ন কোম্পানি আমেরিকায় বিপুল পরিমাণ ফেন্টানাইল এবং সিন্থেটিক ওপয়ডের কাঁচামাল রপ্তানি করে। আমরা চাই চীন থেকে আমাদের দেশে এসব রাসায়নিক কম প্রবেশ করুক। এটি চীন সফরে আমার অন্যতম আলোচনার বিষয়।’

রাশিয়া
ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে পরোক্ষাভাবে সহায়তা করছে চীন। চীনা কোম্পানিগুলোর রপ্তানি করা প্রযুক্তি মস্কো বেসামরিক কাজের পাশাপাশি সামরিক কাজেও ব্যবহার করছে। রাশিয়ায় চীনের এসব পণ্যের রপ্তানি কমাতে দেশটির কর্মকর্তাদের অনুরোধ করবেন ব্লিঙ্কেন।

তাইওয়ান
চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আলোচনার আরেকটি স্পর্শকাতর ইস্যু তাইওয়ান। তাইওয়ানে সামরিক সহায়তা দিয়ে গত মঙ্গলবার ৮০০ কোটি ডলারের সহায়তা বিল অনুমোদন দিয়েছে আমেরিকার পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট। চীন এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আগামী মাসেই তাইওয়ানের নতুন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা গ্রহণ করবেন। তাঁকে যেন বেশি চাপ দেওয়া না হয়, বেইজিংকে সেই অনুরোধ করেবে ওয়াশিংটন।

মধ্যপ্রাচ্য
গত ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি হামলার অভিযোগের পর এ ইস্যুতে আমেরিকা-চীনের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ বেড়েছে। এ হামলার পর ওয়াংয়ের সঙ্গে ফোনালাপ করেন ব্লিঙ্কেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এমন আরও কিছু দেশের সঙ্গেও কথা বলেছেন তিনি। অর্থাৎ, ইরানকে শান্ত রাখার জন্য বেইজিংকে কাজে লাগাতে চায় ওয়াশিংটন। কারণ, বেইজিং ও তেহরানের মধ্যে সম্পর্ক ক্রমশ গভীর হচ্ছে। ইরানের সিংহভাগ জ্বালানি তেল সস্তায় কিনছে বেইজিং।

বিশেষজ্ঞ মত
সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান ইউ স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক আলফ্রেড উ বলেন, ব্লিঙ্কেনের এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে তাঁরা যে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখতে চাইছেন, অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে চাইছেন, তা স্পষ্ট।

বেইজিংভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের প্রতিষ্ঠাতা বং হুইয়াও বলেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করতে চাইছে। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে তাদের মধ্যে সাম্প্রতিক যোগাযোগ এই বার্তা দেয়।

তথ্যসূত্র : রয়টার্স, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, সিনহুয়া