ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রির বাংলাদেশ সফর নিয়ে চলতি মাসের শুরু থেকেই বাংলাদেশ ও ভারতে আলোচনা বেশ তুঙ্গে। এর আগে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের বহু কর্মকর্তা পারস্পরিক সফর করেছেন। কিন্তু কোনো সফর নিয়ে এত আলোচনা–সমালোচনা–পর্যালোচনা দেখা যায়নি। এবার বিক্রম মিশ্রির সফর নিয়ে এত জল্পনা–কল্পনার অন্যতম কারণ—দুই দেশের সম্পর্কের অব্যাহত অবনতি। বলার অপেক্ষা রাখে না, গত ৫৩ বছরে বাংলাদেশ–ভারতের সম্পর্কের পারদ কখনোই এতটা তুঙ্গে ওঠেনি। তাই বিক্রম মিশ্রির সফর নিয়ে এত আলোচনা। তবে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব কবে বাংলাদেশ সফরে আসবেন তা শুরুর দিকে সুনির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও গতকাল শুক্রবার দিল্লির পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী ৯ ডিসেম্বর ঢাকা সফর করবেন বিক্রম মিশ্রি।
যে কারণে এত আলোচনা
গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার নজিরবিহীন অভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এরপর সারাদেশে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গণপিটুনি, মারধোর, থানায় হামলা, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনসহ নানা সহিংস ঘটনা ঘটতে থাকে।
এর মধ্যে গত ২৬ নভেম্বর সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলে পুলিশ। এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় ভারত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, তারা বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এরপর বাংলাদেশে ভারতের পতাকা অবমাননার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়েও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় ভারতে। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি হাসপাতাল ও চিকিৎসকেরা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া রোগীদের চিকিৎসা করবেন না বলে ঘোষণা দেন।
এ ছাড়া আগরতলায় বাংলাদেশে মিশনে গত ২ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্বাদীরা হামলা চালায়। এ ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানায় ঢাকা।
এসব ঘটনায় দুই দেশের মানুষের মধ্যেই তীব্র ভারতবিদ্বেষ ও বাংলাদেশ বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে। অবনতি হয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্কেরও। আর তাই ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সফর নিয়ে এত আলোচনা।
৫ আগস্টের পর প্রথম কোনো ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার বাংলাদেশ সফর
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশ সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেয় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের কোনো বৈঠক হয়নি। গত সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও নরেন্দ্র মোদির মধ্যে বৈঠক করতে অনুরোধ করেছিল ঢাকা। কিন্তু দিল্লি ওই অনুরোধে সাড়া দেয়নি।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন ইস্যুতে ভারতের অব্যাহত অভিযোগের প্রেক্ষিতে ড. ইউনূস বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে এসে পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু মোদি সেই আহ্বানে সাড়া দেননি। তবে গত চার মাসে দু-দেশের মধ্যে তিনটি টেকনিক্যাল কমিটির বৈঠক হয়েছে।
এর আগে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে নয়াদিল্লিতে। অর্থাৎ ৯ ডিসেম্বর বিক্রম মিশ্রির সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবের বৈঠক হতে যাচ্ছে ৫ আগস্টের পর প্রথম কোনো ভারতীয় উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার বৈঠক।
বিক্রম মিশ্রির সফর নিয়ে কী বলছে ভারত
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস বলেছে, বিক্রম মিশ্রির এই সফরটি এমন এক সময়ে হতে চলেছে, যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সম্পর্কে অভূতপূর্ব উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। হিন্দু সংখ্যালঘু ইস্যু এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তারের পর বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কয়েকটি ভারতীয় রাজ্যে বিক্ষোভ হচ্ছে। ফলে ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের এই সফরটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বৈঠকটির ব্যাপারে বিস্তারিত না জানালেও গতকাল শুক্রবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জসওয়াল বলেন, ‘ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের মূল বৈঠকটি হবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মোহম্মদ জসীম উদ্দিনের সঙ্গে। পাশাপাশি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসের সঙ্গেও সৌজন্য সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে মিশ্রির।’
ভারতের আরেক সংবাদমাদ্যম দ্য স্টেটসম্যান জানিয়েছে, এবারের এই বৈঠকে ভারতের অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প পুনরায় শুরু করা, ভিসা ব্যবস্থার সহজীকরণ, সরাসরি ফ্লাইট বাড়ানো এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিষয়গুলো আলোচনা করা হবে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে সবচেয়ে বড় সীমান্ত রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের। ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী গতকাল স্থানীয় এক টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে চাই না। তবে বাংলাদেশ সীমান্তে যদি কেউ আগুন লাগায়, তবে বিহার-উড়িষ্যাও রক্ষা পাবে না। আমি চাই, আমাদের প্রতিবেশীরা আমাদের সঙ্গে শান্তিতে বাস করুক।’
বাংলাদেশ–ভারতের উত্তেজনা কি কমাতে পারবে এই সফর?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান এই উত্তেজনায় বিক্রম মিশ্রির সফর কতটা পানি ঢালতে পারবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে তাঁর এই সফর যে দুই দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা অনুমান করাই যায়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মোহাম্মদ রফিকুল আলম জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বৈঠকে কোন বিষয়টিকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব, তা এখনই স্পষ্ট করে বলা মুশকিল। তবে সাধারণভাবে সব ইস্যু নিয়েই আলোচনা হবে। ভারতের সঙ্গে তো আমাদের অনেক মেকানিজম আছে। তাদের সঙ্গে আমাদের ট্রেড আছে, কানেকটিভিটি আছে, পানি আছে, বর্ডার আছে এগুলো অবশ্যই থাকবে। সুনির্দিষ্টভাবে এজেন্ডায় কী থাকবে সেটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। সাম্প্রতিক ইস্যুও এর মধ্যে থাকবে। সংশ্লিষ্ট উইং এখনো এগুলো নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। উনি আমাদের পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করা ছাড়াও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।’
এর আগে গত বুধবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আমরা তাদের সঙ্গে (ভারতের সঙ্গে) সুসম্পর্ক চাই। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষেরই এটা চাওয়া দরকার এবং এজন্য কাজ করা উচিত।’
ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিক্রম মিশ্রির ঢাকা সফরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো পর্যালোচনা, রাজনৈতিক বোঝাপড়া, ভারতীয় গণমাধ্যমের বাংলাদেশ বিরোধী অপপ্রচার, ভারতে বসে শেখ হাসিনার বক্তব্য, ভিসার জট খোলা, সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, ভারত থেকে নিত্যপণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে দেশটিতে রপ্তানির নানা বাধা সরানোসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে বৈঠকে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলোর অব্যাহত অপপ্রচার নিয়েও আলোচনা হওয়া উচিত বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘এই মুহুর্তে বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। এর মধ্যে ভারতের মিডিয়া যে নিউজ দিচ্ছে সেটা কিভাবে থামানো যায়। প্রয়োজন হলে ভারতের মিডিয়া টিম বাংলাদেশে আসতে পারে। সেটা পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে না হলেও আলাদাভাবে আসতে পারে- সেই সুযোগটা তৈরি করা। তাহলে যে নেতিবাচক খবর হচ্ছে, সেটা হয়তো থামবে।’
অধ্যাপক ইমতিয়াজ আরও বলেন, ‘দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের মধ্যে যদি কথাবার্তা শুরু হয়, তাহলে দুই দেশই বুঝতে পারবে কোথায় কাজ করা প্রয়োজন। এটা ভারতের জন্যই দরকার। কারণ, তাদের বুঝতে হবে, জনগণের যে আকাঙ্খা, যেটা গত কয়েক বছর ধরে প্রতিফলন হয়নি। আবার তাদের দিক থেকে যে সমালোচনাটা আছে সংখ্যালঘু নিয়ে, সেটাও অ্যাড্রেস করা যেতে পারে। আসলে আলোচনা হলেই সমস্যার সমাধান সম্ভব।’
এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত প্রণয় ভার্মা বলেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক মূল্যায়ন করা যাবে না। আমরা আমাদের আলোচনা চলমান রাখবো। আমাদের পরস্পর-নির্ভরতার বিষয় রয়েছে, যেটি দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। সর্বশেষ দুই মাসে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক কিছু উন্নয়ন হয়েছে। আমাদের অনেক ইতিবাচক বিষয় রয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। একসঙ্গে কাজ করে যাব।’