এই মাসের শুরুর দিকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর নাইন ইলেভেন পরবর্তী নির্যাতন কর্মসূচি সম্পর্কে আমেরিকার সিনেট সিলেক্ট কমিটি অন ইন্টেলিজেন্স প্রতিবেদন প্রকাশের ১০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এর মাধ্যমে সেই প্রথম জানা গেল, ক্ষমতার অপব্যবহার কতটা নৃশংস ছিল।
যদিও ৬৭০০ পৃষ্ঠার মূল প্রতিবেদনটি গোপনই ছিল। এটা ব্যাপকভাবে কাটছাট করে প্রকাশ করা হয়। তারপরেও এই কার্যনির্বাহী সারাংশটি আমেরিকার সরকারি স্বীকৃতির একটি জলছাপের মতো। এটা জানিয়ে দেয়, নিয়ম করে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সাম্প্রতিকতম উদাহরণগুলোর মধ্যে এটি একটি।
তিন বছর তদন্তের পরে সংকলিত এই প্রতিবেদনটি নিয়ে এ ধরনের কোনো বিতর্ক নেই যে, আমেরিকা বারবার নির্যাতনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের সনদের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা এই কর্মসূচি সম্পর্কে মিথ্যা বলেছেন। এটি পূর্বের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি লোককে বন্দী করেছে। যদিও সেই সময়ে আশা করা হয়েছিল যে, প্রতিবদেন প্রকাশের পরে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অপরাধীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে। এটি বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য লজ্জাজনক, যাদের অধিকাংশই শারীরিক নির্যাতন না করার ব্যাপারে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞার সাথে একমত। তাদের কোনো আশাই অবশ্য পূরণ হয়নি।
প্রকৃতপক্ষে যখন সিআইএ এই নির্যাতনে প্রধান ভূমিকা পালন করছিল, তখন ইউরোপসহ অন্যান্য শক্তিশালী উদার গণতান্ত্রিক দেশের কর্মকর্তারা ক্ষমতার এই অপব্যবহারে গভীরভাবে জড়িত ছিল। মার্কিন সিনেট কমিটির প্রতিবেদনে এসব প্রমাণের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য প্রদান করা হয়েছে, যা ইউরোপে ইউরোপীয় দেশগুলোর ভূমিকার ব্যাপারে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রচেষ্টাকে সহজতর করেছে। যেমন লিথুয়ানিয়ার বিরুদ্ধে আনা মামলাসহ ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতের সামনে আনা মামলাগুলোর একজন বাদী হচ্ছেন মুস্তাফা আল-হাওসাভি, যিনি রিড্রেসের মক্কেল।
গুয়ানতানামোর একজন বন্দী আল-হাওসাভি, যার মামলার বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইএ আল-হাওসাভিকে ‘রেকটাল ফিডিং’ বা পায়ু পথে খাবার দিয়ে গুরুতর নির্যাতন করে। এতে তাকে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে হয়েছিল। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা এই ‘রেকটাল ফিডিং’কে ধর্ষণ বা যৌন নিপীড়নের একটি রূপ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সিআইএ-এর এই কথিত কর্মসূচীতে ইউরোপে আটক হওয়া জীবিত ব্যক্তিদের দায়ের করা একাধিক মামলা ইউরোপীয় আদালত চলছে। এরমধ্যে গত জানুয়ারী মাসে আল-হাওসাভির পক্ষেই কথা বলেছেন আদালত। এটি করতে গিয়ে মার্কিন সিনেট কমিটির ওই প্রতিবেদনের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করেছিলেন আদালত। অন্ততপক্ষে তাকে বেআইনিভাবে আটক করা হয়েছিল তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে। তাকে লিথুয়ানিয়ায় সিআইএর গোপন আটক কেন্দ্রে বন্দী রাখা হয়েছিল।
নাইন ইলেভেন-এর পর আমেরিকা মানবাধিকারের ব্যাপারে নিজের দেশের আইনের নানা বাধ্যবাধকতা, যেমন নির্যাতন ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তার ভূখণ্ডের বাইরে লোকজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও আটকে রেখেছিল। কিন্তু বাস্তবে সত্য প্রতিষ্ঠা করা একটি কঠিন কাজ। যাই হোক, কিছু কিছু ভুক্তভোগীর সাহসিকতার কারণে কিছুটা হলেও সত্য বেরিয়ে এসেছে। এরা প্রকাশ্যে কথা বলেছেন। অবৈধ আটক ও নির্যাতনের বিবরণ দিয়েছেন। তাদের সাথে ছিলেন আইনজীবী, মানবাধিকার গোষ্ঠী, অনুসন্ধানী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও আইনপ্রণেতারা।
মার্কিন সিনেট কমিটির প্রতিবেদন এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য একটা পথ নির্দশনা দিয়েছে। যেমন ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম এবং রেন্ডিশন প্রজেক্ট–এরা সিআইএ-এর নির্যাতন কর্মসূচির ব্যাপারে সাধারণ মানুষের যেটুকু বোঝার বাকি আছে তা পূরণে কাজ করছে। যাইহোক, ক্ষমতার অপব্যবহারের ২০ বছরেরও বেশি সময় পরে সরকারি গোপনীয়তার নীতি ঠিকই রাজত্ব করে চলেছে। নির্যাতনের ঘটনার অধিকাংশই অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। মার্কিন কর্মসূচির সম্পূর্ণ সত্যতা এবং তারা তাদের মিত্রদের কাছ থেকে কতটা সহযোগিতা পেয়েছে তা প্রকাশ করা হয়নি।
২০১৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি কমিটি একটি জঘন্য প্রতিবেদন তৈরি করে। যুক্তরাজ্য তখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রধান মিত্র দেশ। ওই প্রতিবেদনে প্রমাণ হয়, সিআইএ-এর নির্যাতন কর্মসূচির সাথে সম্পর্কিত অপহরণ ও নির্যাতনের সাথে সরকার জড়িত ছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে অধিকতর তদন্তের জন্য কোনো বিচারকের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি সরকার প্রত্যাখ্যান করে।
আল-হাওসাভি তার নিজের অত্যাচারে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকার বিষয়ে জানার জন্য অপেক্ষা করছেন। যুক্তরাজ্যের ইনভেস্টিগেটরি পাওয়ারস ট্রাইব্যুনাল নামের বিচার বিভাগীয় একটি সংস্থা এই তদন্ত করছে। এই সংস্থা গোয়েন্দা সংস্থা সম্পর্কিত অভিযোগগুলো শুনে থাকে। আবদ আল-রহিম আল-নাশিরির ব্যাপারেও একই ধরনের তদন্ত চলছে। আবু জুবায়দাহ কর্তৃক যুক্তরাজ্যের হাইকোর্টে একটি পৃথক দেওয়ানি মামলাও চলছে। এরা দুজনেই গুয়ানতানামোতে বন্দী ছিলেন।
যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলো এখনো সিআইএ নির্যাতন কর্মসূচি থেকে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে, যেহেতু ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে গুয়ানতানামো বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। আর সাথে সাথে নির্যাতনের জন্য আমেরিকার জবাবদিহির সম্ভাবনা হ্রাস পাচ্ছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ হিসেবে ফিওনুয়ালা নি আওলাইন হলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি গুয়ানতানামোতে মার্কিন নৌঘাঁটি পরিদর্শন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি দুই বছর আগে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নিয়মিত এই নির্যাতনের কাজ চললেও এরজন্য কাউকে দায়বদ্ধ করা হয়নি। অথচ মার্কিন সিনেট কমিটির প্রতিবেদন ছিল এবং নির্বিচারে আটক, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ও নির্যাতিত একজন মানুষও বলার মতো কোনো প্রতিকার না পাওয়ার বিষয়টি ছিল, যার উল্লেখ ওই প্রতিবেদনে করা হয়নি।
তারপরেও যতদিন এসব মামলা থাকবে, ততদিন সেইসব ঘটনায় ক্ষমতা অপব্যবহারের সব রেকর্ড দাগ হয়ে রয়ে যাবে। একদিন হয়তো পুরো সত্যটা জানা যাবেই।
ক্রিস এসডেইল: রিড্রেসের জ্যেষ্ঠ আইনি উপদেষ্টা। রিড্রেস মুস্তফা আল-হাওসাভির পক্ষে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এবং যুক্তরাজ্য তদন্ত ক্ষমতা ট্রাইব্যুনাল-এ মামলা পরিচালনা করে। রিড্রেস নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কাজ করে, যাতে তারা ক্ষতিপূরণ পেতে পারে।