২০২৫ সালে চীনের অর্থনীতিকে ধাক্কা দিতে পারে যে চ্যালেঞ্জগুলো

চীনের আমদানি পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডেনালান্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সচীন সরকার তাদের অর্থনীতিকে চাঙা করার জন্য যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা এ বছর ফলপ্রসু হতে পারে বলে আশা করছে বেইজিং। তবে চোখ রাঙাচ্ছে আবাসন খাতের সংকট, মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি ও নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীনা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়ানোর হুমকি।

মনে রাখা দরকার, ২০২০ সালে করোনা মহামারির যে বিরাট ধাক্কা লেগেছিল চীনের অর্থনীতিতে, তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বেইজিং। গত বছরের শেষের দিকে চীন সরকার ভোক্তাদের ওপর চাপ কমাতে ও দেশীয় ব্যয়কে উৎসাহিত করতে নানা ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে। এসবের ফল ২০২৫ সালে চীন পেতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মত–নতুন বছরে তিনটি বিষয় চীনের অর্থনীতিকে ধাক্কা দিতে পারে।

আবাসন খাত
২০২০ সালে করোনা মহামারি হানা দেওয়ার পর থেকে চীনের আবাসন খাতে মন্দা শুরু হয়েছে এবং তা বছরের পর বছর ধরে অব্যাহত। তখন অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলোর অতিরিক্ত ঋণে লাগাম পরাতে সরকার তিনটি কঠোর নীতি হাতে নিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই পদক্ষেপগুলো সরকারের জন্য বিপর্যয়ই ডেকে এনেছে। সরকারের কঠোর নীতির কারণে তারল্য সংকট সৃষ্টি হয়েছে, যার কারণে রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো তাদের নির্মাণাধীন আবাসন প্রকল্পগুলো শেষ করতে পারেনি। এতে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা ও অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

তবে গত মাসে আবাসিক ভবনগুলোর দাম ১৭ মাসের মধ্যে সবচেয়ে কম গতিতে হ্রাস পেয়েছে, যা আসলে ভঙ্গুর আবাসন খাতে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেয়। ধারণা করা হচ্ছে, গত সেপ্টেম্বরে সরকার ঘোষিত সর্বজনীন প্রণোদনা প্যাকেজটি ধুঁকতে থাকা আবাসন খাতের গোড়ায় একটু শক্তি জুগিয়েছে। এরই মধ্যে পিপলস ব্যাংক অব চায়নার গভর্নর প্যান গংশেং বলেছেন, তিনি বন্ধকী ঋণের সুদহার আরও কমাবেন। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে আবাসন খাত আরেকটু মজবুত হতে পারে।

বাণিজ্য
সম্প্রতি চীনের আমদানি পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেনালান্ড ট্রাম্প। তবে ট্রাম্পের এই হুমকিকে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না আর্থিক পরিষেবা সংস্থা স্টোনএক্স গ্রুপের গ্লোবাল ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজির পরিচালক ভিনসেন্ট ডেলুয়ার্ড। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনা পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ বাণিজ্য শুল্প আরোপ করেও, তাতে চীনের প্রবৃদ্ধির ওপর খুব একটা প্রভাব পড়বে না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রে চীনের আমদানি পণ্য এখনো এক অঙ্কের মধ্যেই রয়েছে।’

আবার চীন সরকারও সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি অতিরিক্ত বাণিজ্য শুল্ক বাড়ায়, সেটি সারা বিশ্বের সরবরাহ শৃঙ্খলকেই ব্যহত করবে। এতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে এবং আখেরে মার্কিন ভোক্তাদের জীবনই কঠিন হয়ে উঠবে।

চীনে আবাসন খাতে বছরের পর বছর ধরে মন্দা চলছে। ছবি: রয়টার্সযুক্তরাষ্ট্রে চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেন, ‘চীন বিশ্বাস করে যে, চীন-মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সহযোগিতার মূল কথা হলো পারস্পরিক সুবিধা এবং উভয় পক্ষের লাভবান হওয়া। বাণিজ্য যুদ্ধ ও শুল্ক যুদ্ধে কেউ বিজয়ী হতে পারে না।’

লিউ পেংইউ আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের উচিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মকে সম্মান করা এবং চীন-মার্কিন সহযোগিতার জন্য একটি ভালো পরিবেশ তৈরি করা। চীন অবশ্যই তার সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থ দৃঢ়ভাবে রক্ষা করবে।’

ভোক্তা ব্যয়
স্টোনএক্স গ্রুপের গ্লোবাল ম্যাক্রো স্ট্র্যাটেজির পরিচালক ভিনসেন্ট ডেলুয়ার্ড বলেন, ‘বেসরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ৫০ শাতংশ। ফলে অভ্যন্তরীণ আস্থা যদি বাড়ে, প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। চীনের অনেক ধনী ব্যক্তি ও রপ্তানিকারকেরা বিদেশে প্রচুর অর্থ মজুত করে রেখেছেন। সিঙ্গাপুর, দুবাই ও হংকংয়ে মার্কিন ডলারের আমানত বেড়ে যাওয়া তার বড় প্রমাণ। বিদেশে থাকা নগদ অর্থ যদি দেশে (চীনে) ফিরিয়ে আনতে তাদের রাজি করানো যায়, তাহলেও অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে।’

চীনে এখন ভ্রমণের সর্বোচ্চ মৌসুম। এখনই বোঝা যাবে, চীন তার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে যেসব নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে, সেগুলো কতটুকু কার্যকর হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু শঙ্কার কথাও বলেছেন নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের কিউ স্কুল অব গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ডিন মেরি গ্যালাঘার। ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স রিভিউতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘চীনা প্রবৃদ্ধি এখনো ঝুঁকিতে আছে। বিনিয়োগ খুব একটা সম্প্রসারিত হয়নি এবং আবাসন খাতের প্রবৃদ্ধিও আগের অবস্থায় ফিরে আসেনি। অন্যদিকে ‘‘কঠোর জিরো কোভিড’’ নীতি থেকে চীন সরে এলেও চীনা নাগরিকদের পারিবারিক ব্যয় প্রত্যাশিত মাত্রায় ফেরেনি।’

চীনের আমদানি পণ্যের ওপর ৬০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডেনালান্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সএসব কারণে ভোক্তারা এখনো চাপের মধ্যে রয়েছে। সম্পত্তির দাম কমে যাওয়ায় মোট সম্পদও কমে গেছে। এ ছাড়া মহামারির ধাক্কার কারণে এখনো অনেকেই আর্থিকভাবে অনিরাপদ বোধ করছে। গ্যালাঘার বলেন, ‘চীনের প্রধান বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ায় অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস
নতুন বছরের শুরুতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ‘কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছি। আমাদের অভূতপূর্ব উন্নয়ন হয়েছে। সামনে আমাদের প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।’

কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ২০২৩ সালে ৫ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছিল চীন সরকার। এর পরের বছরেও ৫ শতাংশের কাছাকাছি জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে সরকার জিডিপির যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন চীনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংসহ অনেক অর্থনীতিবিদ।

এদিকে মুডিস রেটিং চীনের ২০২৫ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ দশমিক ২ শতাংশ করেছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

তথ্যসূত্র: নিউজউইক, ওয়ার্ল্ড পলিটিক্স রিভিউ, নিক্কেই এশিয়া ও সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট