ইউরোপীয় ইউনিয়ন লিথিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের স্থানীয় সরবরাহ সুরক্ষিত করতে চায়। কমাতে চায় চীনসহ বিদেশি সরবরাহকারীদের ওপর নির্ভরতা। কারণ, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে (গ্রিন এনার্জি) রূপান্তরের জন্য ইউরোপের প্রচেষ্টার চাবিকাঠি এই লিথিয়াম।
‘সাদা সোনা’ খ্যাত লিথিয়াম হলো স্মার্টফোন, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ডিভাইসগুলোয় ব্যবহৃত ব্যাটারির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বর্তমান আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে লিথিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।
ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা অনুসারে, ইউক্রেনে আনুমানিক ৫ লাখ টন অব্যবহৃত লিথিয়াম রয়েছে, যা ইউরোপের বৃহত্তম মজুতগুলোর মধ্যে একটি। বিশ্বের এই বিরল সাদা ধাতুর আনুমানিক ৫ শতাংশ মজুত রয়েছে ইউরোপে।
রাশিয়া ২০২২ সালে সর্বাত্মক হামলা শুরুর পর থেকে ইউক্রেনের চারটি লিথিয়াম মজুতের দুটি দখল করে নিয়েছে। রাশিয়ার ইউক্রেনের লিথিয়াম মজুত জব্দ করা বাকি ইউরোপ এবং মহাদেশটির পরিবেশবান্ধব জ্বালানিতে স্থানান্তরের প্রচেষ্টাকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশ্বে জীবাশ্ম জ্বালানির সম্পদ প্রায় শেষের পথে। এই পরিস্থিতিতে সবুজ শক্তিকে কার্যকরভাবে ব্যবহারে জোর দিচ্ছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা।
আমেরিকাভিত্তিক ইকোলজিক্যাল ফিউচার গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ রড স্কুনওভার বলেন, ‘এটি অসম্ভব নয় যে, ইউক্রেনের মজুত দখল করা মস্কোর জন্য যুদ্ধের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। যদিও রাশিয়ার নিজেরই উল্লেখযোগ্য লিথিয়াম মজুত রয়েছে।
বলে রাখা ভালো, লিথিয়ামের মজুতের ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়া, চীন ও চিলির মতো ততটা সমৃদ্ধ নয় ইউরোপ। বিশ্বের প্রায় ৫ শতাংশ লিথিয়ামের মজুত থাকলেও মহাদেশটিতে এই ধাতু উত্তোলন সেভাবে হচ্ছে না। মহাদেশটি এখনও আমদানি করা পরিশোধিত লিথিয়ামের ওপর নির্ভর করে, যা সাধারণত চীন থেকে আসে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) স্বায়ত্তশাসনের নামে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন চায়। গত মে মাস থেবে কার্যকর হওয়া ইইউ-এর সমালোচনামূলক কাঁচামাল আইনের লক্ষ্য হলো– লিথিয়াম চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের মতো ২০৩০ সালের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎপাদিত উৎস থেকে পূরণ করা ৷ এই আইন আরও নির্দিষ্ট করে যে, এই পণ্যগুলোর বার্ষিক ব্যবহারের ৬৫ শতাংশের বেশি যেকোনো একক দেশ থেকে নেওয়া উচিত। ইউরোপের অব্যবহৃত মজুতের কারণে প্রথম দেখায় এই লক্ষ্যগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে অর্জনযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত উত্তোলণ শুরু হলে ১০ শতাংশ লিথিয়াম উৎপাদন লক্ষ্য অর্জন সম্ভব বলে মনে হয়।
ইউরোপে মজুত লিথিয়াম সম্ভবত ওই অঞ্চলের চাহিদার অর্ধেক বা তারও বেশি পূরণ করতে সক্ষম। তবে ইউরোপের মাটির নিচ থেকে লিথিয়াম তুলে আনার কাজটি সহজ নয়। ধাতুটির বেশির ভাগ কঠিন শীলার ভাঁজে পাওয়া যায়। লিথিয়ামের খনিগুলো হয় অনেক বড় এবং পানিযুক্ত, যেখানে থাকে দূষণকারী নানা পদার্থ। ফলে এ ধরনের খনি থেকে লিথিয়াম উত্তোলনের প্রকল্প বিরোধিতার মুখোমুখি হয়। বিশেষত পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো এবং সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের তরফ থেকে ব্যাপক বিরোধিতার মুখোমুখি হতে হয়।
সার্বিয়ার কথাই ধরা যাক। দেশটির পশ্চিমে জাদার উপত্যকায় বিশাল লিথিয়ামের মজুত রয়েছে। রিও টিন্টো নামের সুবিশাল খনিটিতে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একটি প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কার্যক্রমের অগ্রগতি থেমে আছে। ২০২১-২২ সালে বিক্ষোভের একটি ঢেউ দেশটির সরকারকে প্রকল্পের সনদ প্রত্যাহারে বাধ্য করে। অবশ্য নতুন চুক্তির পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পের কাজ পুনরায় শুরু হয়। সার্বিয়ার সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি ২০২৬ সাল নাগাদ প্রকল্পের অবকাঠামো নির্মাণ শুরু করতে সক্ষম হতে পারে। তবে এটি অবশ্যম্ভাবীভাবে জনসাধারণের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে, যা আবার প্রকল্পটিকে বাধার মুখে ফেলতে পারে।
পর্তুগালের উত্তর বারোসো অঞ্চলের একটি প্রকল্প একই ধরনের সংকটে রয়েছে। সাভানা নামের একটি ব্রিটিশ খনি সংস্থা চারটি ওপেন পিট (উন্মুক্ত পদ্ধতিতে) খনি চালু করতে চায়, যা প্রতি বছর আনুমানিক ৫ লাখ বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাটারির জন্য পর্যাপ্ত লিথিয়াম উৎপাদন করতে পারে। কিন্তু এই খনি কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় ভূমির মালিকানা স্থানীয় সম্প্রদায়ের, যা তারা বিক্রি করতে চায় না। এ নিয়ে বিনিয়োগকারীরা সাবধানে পা ফেলবে এটাই স্বাভাবিক। শুধু সেখানেই নয়, চেক প্রজাতন্ত্র, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স ও স্পেন– যেখানে যেখানে কঠিন শীলায় লিথিয়ামের মজুত রয়েছে, সবখানে একই অবস্থা।
বলা প্রয়োজন যে, ওপেন পিট মাইনিংই একমাত্র সমস্যা নয়। লিথিয়াম ভূগর্ভে গরম ও নোনতা পানিতেও পাওয়া যায়। জার্মানির রাইন উপত্যকায় ১৭টি লাইসেন্স আছে ভলকান এনার্জির। তাদের মতো কোম্পানিগুলো ভূ-তাপীয় প্রস্রবণ থেকে ভূ–তল পর্যন্ত নোনাপানি পাম্প করে এবং বাকি উপদানগুলোকে নিচে পাঠানোর আগে লিথিয়াম ফিল্টার করে। এটি পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর।
লিথিয়াম সরবরাহের বড় সক্ষমতার দেশ হলো চীন। দেশটি ভর্তুকি ও সাময়িক কর প্রত্যাহারের মাধ্যমে ২০১০-এর দশকে প্রচুর পরিমাণে লিথিয়াম উৎপাদনে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা অর্জন করে। তারা পরিশোধিত লিথিয়াম দিয়ে বাজার সয়লাব করে ফেলেছে। ফলে দাম কমেছে, যা অনেক প্রতিযোগিকে দূর করেছে। শুধু কয়েকটি ইউরোপীয় প্রকল্প বর্তমানে বিশেষ খরচে চলছে। এ ক্ষেত্রে ইউরোপে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা চলছে।
তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, উত্তোলনের জটিলতার কারণে এভাবে নিষ্ক্রিয় বসে থাকাটা কাজের কথা নয়। কারণ, দাম চিরকাল কম থাকবে না। লাতিন আমেরিকা, এশিয়া, অস্ট্রেলিয়াজুড়ে প্রকল্পগুলোকে পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা লিথিয়ামের চাহিদা–জোগানে বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ইউরোপের চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ। যদি কৌশলগত কারণে ইউরোপ আরও লিথিয়াম উৎপাদনের ব্যয়বহুল সংকল্পে মরিয়া হয়, তবে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আরও সহায়তা দিতে হবে। এ ধরনের প্রকল্পে সরকারি তহবিল মেলে, সেটা এবার পরিমাণে যা–ই হোক না কেন।
তবে এই প্রকল্পগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য দরকারি নথিপত্র গুছিয়ে আনা ভীষণ জটিল ও সময়সাপেক্ষ। লিথিয়ামের প্রবাহ হয়তো উত্তোলণের প্রক্রিয়ায় সাহায্য করবে। কিন্তু ইউরোপ এই বাধাগুলো দূর করতে না পারলে লিথিয়াম প্রকল্পগুলো পরিকল্পনা পর্যায়েই থেকে যাবে। আর লিথিয়ামের আমদানি নির্ভরতা কমাতে না পারলে হয়তো ইউরোপের স্বায়ত্তশাসন একটি কল্পনা হয়েই থাকবে।
দ্য ইকোনমিস্ট ও রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি অবলম্বনে