শহীদ রাষ্ট্রপতি, বীর উত্তম জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের এক ক্ষণজন্মা মহান ব্যক্তিত্ব। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে জাতির চরম সঙ্কটময় মুহূর্তে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আগমন। এরপর রণাঙ্গনে যুদ্ধ পরিচালনা ও যুদ্ধ প্রশাসনের নীতিনির্ধারণে অসামান্য অবদান রেখে আপামর জনমানসে মহানায়কের আসনে অধিষ্ঠিত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর অভ্যুত্থান আর পাল্টা-অভ্যুত্থানের ফলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্ট অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতার দৃশ্যপটে আসেন জিয়াউর রহমান।
এরপর প্রেসিডেন্ট হিসেবে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ পরিচালনা করেন মহান এই নেতা। দেশের ইতিহাসে তাঁর শাসনামল (১৯৭৫-১৯৮১) এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। স্বল্প সময়ের শাসনামলে নানা সংকটে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির এক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে আসেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন জিয়াউর রহমান।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন এবং সময়োপযোগী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অবস্থান ও গতিপথ নির্ধারণ—তাঁর এসব বহুমাত্রিক সাফল্যের কথা সুবিদিত ও বহুল চর্চিত।
তবে এই আলোচ্য নিবন্ধের বিষয়বস্তু কৃষি আর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, যেখানে মিশে আছে শহীদ জিয়ার স্বপ্ন। তিনি ছিলেন মাটি ও মানুষের নেতা। এ দেশের গরিব, মেহনতি মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম সাধনা।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত এক দেশ। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই ভূখণ্ড ছিল অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এবং কৃষি উৎপাদন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। আর খাদ্য ঘাটতি ছিল এর নিত্যসঙ্গী। এমন এক অনিশ্চিত সময়ে দায়িত্ব নেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তিনি একাধারে ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, রাষ্ট্রনায়ক ও জনবান্ধব নেতা।
তিনি উপলব্ধি করেছিলেন—স্বাধীনতা রক্ষার জন্য স্বনির্ভর অর্থনীতি অপরিহার্য, আর তার মূলে রয়েছে কৃষি। তাই কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও পল্লী উন্নয়নকে তিনি জাতীয় উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশে শুরু হয় এক বাস্তবমুখী সবুজ বিপ্লবের যুগ।
খাল খনন কর্মসূচি—সেচ ও উৎপাদনে বিপ্লব
কৃষি উৎপাদনে সেচের গুরুত্ব অপরিসীম। ফসল উৎপাদনে প্রয়োজনীয় পানির জন্য এ দেশের কৃষকরা প্রধানত বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ১৯৭১ সালে দেশের মোট আবাদি জমির মাত্র ১৫ শতাংশ ছিল সেচের আওতায়। বৃষ্টির পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর তাগিদ থেকেই কৃষিবান্ধব জিয়া সরকার বিস্তৃত পরিসরে খাল খনন কর্মসূচির উদ্যোগ গ্রহণ করে। ‘খাল খনন কর্মসূচি’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুকনো বা খরা মৌসুমে কৃষকদের জন্য পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে তাঁর সরকার।
খাল খনন কর্মসূচিকে জিয়াউর রহমান একটি ‘বিপ্লব’ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত পরিচালিত কৃষিবান্ধব এই কর্মসূচি ছিল তাঁর যুগান্তকারী এক উদ্যোগ। ২৬ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খননের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের কৃষিতে সেচ ব্যবস্থায় বিপ্লব নিয়ে আসেন।
এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল—উপরিভাগের পানি ব্যবহার করে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমানো, কৃষিতে সেচ সম্প্রসারণ, মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি, গ্রামীণ অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। যশোরের শার্শা উপজেলার উলশী গ্রামে তিনি নিজ হাতে কোদাল চালিয়ে এই কর্মসূচির সূচনা করেন। এ জন্যই কৃষকসমাজ তাঁকে ভালোবেসে ডাকত ‘রাখাল প্রেসিডেন্ট’।
কৃষি সংস্কার ও যান্ত্রিকীকরণ
কৃষির আধুনিকীকরণে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করেছিলেন জিয়াউর রহমান। তাঁর আমলে প্রণীত ১৯৭৭ সালের ‘বীজ অধ্যাদেশ’ দেশের কৃষি আধুনিকায়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। দেশব্যাপী কৃষি উপকরণ বিতরণ ব্যবস্থায় সংস্কার এনে তিনি কৃষকদের জন্য সার, সেচযন্ত্র ও ট্রাক্টর সহজলভ্য করে তোলেন। পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে যৌথ খামার ও সমবায়ভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করেন।
১৯৮০ সালের জুলাইয়ে জিয়া সরকার দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এ পরিকল্পনারও প্রধান লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ও বিকাশ। এর অধীনে কৃষি পদ্ধতির দ্রুত রূপান্তরের উদ্দেশ্যে আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনের জন্য বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির নিমিত্তে কৃষিখাতে যান্ত্রিকীকরণ এবং জমিতে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়।
দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় কৃষিতে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি প্রদান করা হয় এবং সুলভ মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবস্থাসহ সার ও কীটনাশকের মূল্য কৃষকের সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়। জিয়াউর রহমান কৃষিকে শুধু উৎপাদন ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় পুনর্জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।
কৃষি ঋণ, গুদাম ও খাদ্যনিরাপত্তা নীতি
১৯৭৪ সালের মতো দুর্ভিক্ষ যেন দেশে না হয়, সেজন্য জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে খাদ্যশস্য মজুদের ব্যবস্থা করেন জিয়াউর রহমান। সরকারিভাবে ন্যায্যমূল্যে চাষীদের কাছ থেকে ধান ও চালের মতো খাদ্যশস্য ক্রয়ের ব্যবস্থা সম্প্রসারণও জোরদার করা হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি গঠন করেন ‘বিশেষ কৃষি ঋণ তহবিল’, যেখানে ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে প্রান্তিক কৃষকদের জন্য জামানতবিহীন ঋণ প্রদান শুরু হয়।
পরবর্তীতে ১৯৭৮ সালে তিনি চালু করেন শস্য গুদাম ঋণ কর্মসূচি, যার কল্যাণে কৃষকরা ফসল গুদামে রেখে প্রয়োজনমতো তা বিক্রি করার সুযোগ পায়। খাদ্য নিরাপত্তায় তিনি গড়ে তোলেন বৃহৎ জাতীয় খাদ্য মজুদব্যবস্থা। পাশাপাশি কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান-চাল ক্রয়ও নিশ্চিত করে করেন তিনি। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে রেকর্ড ১.০৩ মিলিয়ন টন চাল সংগ্রহ করা হয় এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চাল রপ্তানি সম্ভব হয়।
ভূমি সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচার
১৯৮০ সালে জাতীয় সংসদে পেশ করা ভূমি সংস্কার প্রস্তাবে তিনি কৃষিজমির সীমা নির্ধারণ, বর্গাচাষ আইন, খাসজমির বণ্টন ও ভূমিকর পুনর্গঠন প্রস্তাব করেন। এর লক্ষ্য ছিল প্রকৃত কৃষকের হাতে জমি পৌঁছে দেওয়া এবং উৎপাদন বাড়ানো। রাষ্ট্রপতি জিয়া বর্গাচাষীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করেন। অন্যান্য ব্যবস্থার সঙ্গে খাসজমি বন্দোবস্ত প্রদানে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
জমি বন্ধক দিতে হত না বলে বর্গাচাষীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে কৃষিঋণ নিতে পারতেন। কৃষি উৎপাদনে সমবায় পদ্ধতির প্রচলনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়। জিয়া সরকারের গৃহীত এসব কৃষিবান্ধব কর্মসূচির ফলে দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং পরপর দুই বছর রেকর্ড পরিমাণ খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়।
গবেষণা, সার ও চিনি শিল্পে আধুনিকায়ন
জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৮১ সালে) বার্ষিক ৫.২৮ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে চালু হয় আশুগঞ্জ সার কারখানা, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই) প্রতিষ্ঠা করে ফসল গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে তাঁর সরকার। গম গবেষণা কেন্দ্র (দিনাজপুর, ১৯৮০) প্রতিষ্ঠা করে তিনি আমদানি নির্ভরতা কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৬ সালে ‘বাংলাদেশ সুগার অ্যান্ড ফুড ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন’ গঠন করে চিনি শিল্পকে আধুনিক রূপ দেন তিনি।
পাট, রেশম, রাবার উৎপাদন ও রপ্তানি
‘সোনালি আঁশ’ খ্যাত পাটচাষ সম্প্রসারণের ব্যবস্থা করা হয়। কৃষক যেন পাটের ন্যায্যমূল্য পান সেজন্য মূল্য নির্ধারণসহ নানা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বহুমুখী পাটজাত পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের পাটকলগুলোতে উৎপাদন-সহায়ক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়। জিয়ার আমলে এ দেশে রেশম ও রাবার উৎপাদন সম্প্রসারণ করা হয়।
পল্লী বিদ্যুতায়ন ও গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতি
১৯৭৭ সালে শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুগান্তকারী সাফল্য নিয়ে আসে। সেচ ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণে বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে কৃষিখাতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায় উল্লেখযোগ্য হারে।
বৃক্ষরোপণ ও ফল-সবজি চাষে জনগণকে সম্পৃক্তকরণ
জিয়াউর রহমান জনগণকে বাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধারে ও পতিত জমিতে ফল ও সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করেন। বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ ও কৃষি বৈচিত্র্যেও যুগান্তকারী ভূমিকা রাখে তাঁর সরকার।
পল্লী উন্নয়ন ও আত্মকর্মসংস্থান
যুব মন্ত্রণালয় (১৯৭৮) ও যুব উন্নয়ন কেন্দ্র (১৯৮১) প্রতিষ্ঠা করে যুবকদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ করে দেন জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড), পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ) এবং এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কেন্দ্র (সিআইআরডিএপি)—এই তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি পল্লী উন্নয়নের টেকসই মডেল গড়ে তোলেন, যার সুফল এদেশের কৃষকরা আজও উপলব্ধি করতে পারেন।
কৃষি যন্ত্রপাতি মেরামত ও সংরক্ষণে কৃষকদের সহযোগিতা করার জন্য ৬ হাজার বেকার যুবককে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এমনকি তারা যেন নিজ নিজ এলাকায় ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষি প্রকৌশল শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেজন্য প্রয়োজনীয় ঋণ ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহের সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
দেশ গঠন ও কৃষির উন্নয়নে ‘১৯ দফা কর্মসূচি’
১৯ দফা কর্মসূচি ছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের একটি কালজয়ী অবদান। রাষ্ট্রনীতিবিদরা এই ১৯ দফা কর্মসূচিকে একটি যুগান্তকারী ‘ভিশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। জিয়াউর রহমান তাঁর এই কর্মসূচি নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক গণসংযোগ করেন। চার সপ্তাহের জনসংযোগ কর্মসূচিতে তিনি ৭০টি জনসভায় ১৯ দফা কর্মসূচির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
১৯ দফা কর্মসূচির ৩নং দফায় ‘সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসাবে গঠন করা’, ৫নং দফায় ‘সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতি জোরদার করা’ এবং ৬নং দফায় ‘দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে’—তার ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ করা হয়।
স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচি
স্বনির্ভর বা আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবনের অন্যতম ব্রত ছিল। ভিক্ষুকের হাতকে ‘কর্মীর হাতে পরিণত করার’ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একটি জাতীয় আন্দোলন হিসেবে ১৯৭৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচির সূচনা করেন তিনি। গ্রাম, ইউনিয়ন, থানা, মহকুমা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে স্বনির্ভর সমিতি গঠন করা হয়। স্বনির্ভর সমিতির তত্ত্বাবধানে গ্রামে বৃক্ষরোপণ, মাছ ও হাঁস-মুরগি পালনের খামার তৈরি করা হয়।
জিয়ার স্বনির্ভর বাংলাদেশ কর্মসূচির আরেকটি সাহসী পদক্ষেপ ছিল ‘গ্রাম সরকার’ ব্যবস্থা। গ্রাম সরকারের ক্ষমতা ও কর্মকাণ্ডের পরিধির মধ্যে অন্যতম ছিল, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকারি নীতি কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা ও সরকারের সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তদারকি করা।
বস্তুত রাষ্ট্রপতি জিয়ার এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হওয়ায় কৃষক ও গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমানের উন্নতি সাধিত হয়। জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন, গ্রামবাংলার উন্নতির ওপরই নির্ভর করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। এই লক্ষ্যে তিনি তাঁর স্বল্পকালীন শাসনামলে গ্রামীণ কৃষি ও কৃষক সমাজের উন্নতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। এ দেশের কৃষক সমাজ তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন ‘একজন বন্ধু ও একান্ত স্বজন’ হিসেবে।
জনপ্রিয় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও কৃষি সাংবাদিক শাইখ সিরাজ ১৯৯৫ সালে বিটিভিতে প্রচারিত ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে কৃষি ক্ষেত্রে অনবদ্য অবদানের জন্য শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে ‘কৃষকপিতা’ উপাধি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
মৎস্যখাতের উন্নয়ন
জিয়াউর রহমান মৎস্য ও কৃষিকে একসঙ্গে জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৭৯ সালে শুরু করেন ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ’, যা আজও পালন করা হয়। এর মাধ্যমে দেশব্যাপী মাছ চাষে সচেতনতা ও আগ্রহ তৈরি হয়। মৎস্যচাষীদের জন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা নিশ্চিত করা হয়।
সরকারি ও বেসরকারি হ্যাচারি স্থাপনের ফলে পোনা উৎপাদনে আত্মনির্ভরতা আসে। মৎস্যজীবীদের সমবায় সংগঠন গঠন করে বিপণন ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হয়। মাছ সংরক্ষণের জন্য হিমাগার নির্মাণ করা হয়।
জিয়াউর রহমান হাজা-মজা পুকুর ও জলাশয় সংস্কার করে এতে পরিকল্পিত উপায়ে মাছ চাষের ব্যবস্থা করেন। দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনার অধীনে খননকৃত খালে ‘মাছচাষ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছিল। মৎস্যখাতের উন্নয়নে, বিশেষ করে চিংড়ি চাষ ও চিংড়ি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
প্রাণিসম্পদ খাতে ঐতিহাসিক অবদান
শহীদ জিয়ার শাসনামলে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে গবাদিপশুর জাত উন্নয়ন, টিকা কর্মসূচি এবং পশুচিকিৎসা সেবা জোরদার, পশু খামার প্রতিষ্ঠা ও পশুখাদ্য উৎপাদন কারখানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এছাড়া হাঁস-মুরগি খামার সম্প্রসারণ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে তাঁর সরকার। ‘দুধভিত্তিক অর্থনীতি’ গড়ে তুলতে বিভিন্ন গ্রামে দুগ্ধ সমবায় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পদক্ষেপগুলোর ফলে মাংস, ডিম ও দুধ উৎপাদনে বাংলাদেশে বিপ্লব সাধিত হয়।
সমুদ্র অর্থনীতির পথিকৃৎ জিয়া
১৯৮১ সালে তিনি ‘সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’ গঠন করেন। বঙ্গোপসাগরের সম্পদ আহরণ ও সামুদ্রিক গবেষণায় দেশীয় বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করেন। ‘হিজবুল বাহার’ জাহাজে চড়ে বঙ্গোপসাগরে নিজে সফর করে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন, যা দেশের ‘ব্লু ইকোনমি’ চিন্তার সূচনা করে। তাঁর দৃষ্টিতে সমুদ্র ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির নতুন সীমানা—মৎস্য সম্পদ, জ্বালানি, খনিজ, নৌ-বাণিজ্য ও পর্যটনের অফুরন্ত সম্ভাবনার আধার।
সবুজ বিপ্লবের সাফল্য ও উত্তরাধিকার
জিয়াউর রহমানের কৃষিনীতির ফলেই খাদ্যশস্যে রেকর্ড উৎপাদন ঘটে, কৃষকের আয় ও আত্মবিশ্বাস বাড়ে, দারিদ্র্য হ্রাস পায়, গ্রামীণ অর্থনীতি স্থিতিশীল হয় এবং বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি হয়েও তিনি মাঠে নেমে কৃষকের সঙ্গে কাজ করেছেন; কখনও লাঙল হাতে, কখনও কোদাল হাতে। এই প্রতীকী নেতৃত্ব তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরদিনের ‘কৃষকের বন্ধু’ করে রেখেছে।
জিয়াউর রহমান কেবল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা বা রাষ্ট্রনায়কই নন, তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সবুজ বিপ্লবের স্থপতি। তাঁর কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, ব্লু ইকোনমি ও পল্লী উন্নয়ন নীতি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও আত্মনির্ভরতার ভিত্তি স্থাপন করে দিয়েছে। আজ আমরা যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের কথা বলি, তার বীজ বপন করেছিলেন তিনি নিজ হাতে খালের মাটিতে কোদাল চালিয়ে, কৃষকের পাশে দাঁড়িয়ে। ইতিহাস তাই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করবে বাংলাদেশের সবুজ বিপ্লবের এক মহানায়ক হিসেবে।
লেখক: সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা জেলা চ্যাপ্টার, এগ্রিকালচারিস্টস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এ্যাব)
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]