ইরানকে ঘিরে চীন–রাশিয়ার নতুন খেলা!

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই? কারণ, একের পর এক যেভাবে রাশিয়া, চীন আর ইরান একই লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেছে, তাতে আন্তর্জাতিক মহলে উঠছে বড় প্রশ্ন—আমেরিকার বিরুদ্ধে কি তৈরি হচ্ছে নতুন শক্তিশালী জোট?

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো—এই পুরো কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটি নাম—আব্বাস আরাঘচি। কয়েক দিন আগেও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেখা গেছে মস্কোতে। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন তিনি। রাশিয়া প্রকাশ্যেই জানিয়ে দেয়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বৈশ্বিক ‘অস্থিতিশীলতা’ বাড়াচ্ছে। মস্কো আরও দাবি করে, ওয়াশিংটনের চাপ এবং সামরিক উপস্থিতিই পুরো অঞ্চলকে বিস্ফোরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

আর এবার আরাঘচি উড়ে যান বেইজিংয়ে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন এবং চীনের সমর্থন অর্জন করেন। বৈঠক শেষে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই সরাসরি বলেন, চীন ইরানের ‘বিশ্বস্ত কৌশলগত অংশীদার’। তিনি এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধকে ‘অবৈধ’ বলেও মন্তব্য করেন।

এখন প্রশ্ন উঠছে—রাশিয়া, চীন আর ইরান—এই তিন দেশ কি ধীরে ধীরে একই কূটনৈতিক ফ্রন্টে চলে আসছে? বিশ্লেষকরা বলছেন, ঘটনা কিন্তু সেদিকেই এগোচ্ছে। কারণ, ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকেই রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। অন্যদিকে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের কারণে ইরানও ক্রমশ পশ্চিমা বলয় থেকে দূরে সরে গেছে। ফলে এখন এই তিন দেশের স্বার্থের জায়গাগুলো এক হতে শুরু করেছে।

একদিকে রাশিয়া চায় আমেরিকার বৈশ্বিক প্রভাব কমাতে। অন্যদিকে চীন চায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাব বাড়াতে। আর ইরান চাইছে এমন শক্তিশালী মিত্র, যারা ওয়াশিংটনের চাপের সামনে তাকে একা ফেলবে না। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন সমীকরণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি হয়তো আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নয়, কিন্তু এই তিন দেশের ‘কৌশলগত সমন্বয়’ দ্রুতই বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ সংকট, তেলের বাজার, মার্কিন অবরোধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ইস্যুতে তিন দেশের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি।

ইতিমধ্যে রাশিয়া ও চীন দুই দেশই জোর দিচ্ছে ‘আলোচনা ও কূটনৈতিক সমাধান’-এর ওপর। কিন্তু একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপেরও কড়া সমালোচনা করছে। আর এটিই এখন ওয়াশিংটনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। কারণ, এত দিন আমেরিকা ইরানকে অনেকটাই একঘরে করে রাখতে পেরেছিল। কিন্তু এখন যদি বেইজিং ও মস্কো প্রকাশ্যে তেহরানের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে পুরো খেলার হিসাব বদলে যেতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা এখনো কমেনি। তেলের বাজার এখনো অস্থির। আর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কাও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যেই সামনে আসছে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই চীন সফরে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেখানে শি চিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে ইরান ইস্যুই হতে পারে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়।

অর্থাৎ এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিশ্বরাজনীতির দাবার বোর্ডেও শুরু হয়ে গেছে নতুন লড়াই। এক পাশে আমেরিকা, অন্য পাশে ধীরে ধীরে কাছাকাছি আসা চীন, রাশিয়া আর ইরান। এখন দেখার বিষয়—এটা কি শুধুই সাময়িক কূটনৈতিক সমন্বয়, নাকি সত্যিই জন্ম নিচ্ছে আমেরিকা-বিরোধী নতুন শক্তিশালী জোট?