তাইপেইর চিয়াং কাই-শেক মেমোরিয়াল হল। ভেতরে চলছে অস্ত্রসহ মার্চ প্রশিক্ষণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের সূচির মধ্যেই এই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে একদল তরুণ–তরুণী। তারা তাইওয়ানের সামরিক বাহিনীর সদস্য নয়, একেবারেই সাধারণ নাগরিক।
মার্চের শেষ সপ্তাহে ধারণ করা রয়র্টার্সের ভিডিওতে দেখা যায়, দেশপ্রেমে বলিয়ান এসব তরুণ–তরুণী এয়ারসফট রাইফেল ড্রিল, গুলির মধ্যে চলাচলের কৌশল ও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রাথমিক চিকিৎসা পদ্ধতি শিখছে। তাদের অনুশীলনের মধ্যে রয়েছে লক্ষ্যবস্তুতে এয়ার গান ছোড়া, আড়ালে থেকে অগ্রসর হওয়া ও রক্তপাত বন্ধ করার নিধান।
চীনের সাথে তাইওয়ানের বিরোধ বিশ্ব রাজনীতিতে বরাবরই আলোচনার বিষয়। চীন স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে এবং একে একটি বিচ্ছিন্ন প্রদেশ হিসেবে গণ্য করে। বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হলো দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সাথে পুনরায় একীভূত করা। আর যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকে রক্ষা ও দেশটির শক্তি বাড়াতে সহায়তা দিয়ে আসছে।
আসলে প্রতিবেশী এই দুই দেশের বিরোধ ও উত্তেজনায় তাইওয়ানের পক্ষ নেওয়ার ইতিহাস আছে যুক্তরাষ্ট্রের। তাইওয়ান দ্বীপকে নিজের বিদ্রোহী অঞ্চল বলেই বিবেচনা করে আসছে চীন। এজন্য তাইপের সঙ্গে বহির্বিশ্বের কারও কূটনৈতিক যোগাযোগকে স্বীকৃতি দেয় না বেইজিং। বিপরীতে তাইওয়ানকে অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়াতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী ১৪ থেকে ১৫ মে বেইজিংয়ে বৈঠকে বসবেন। প্রায় এক দশকের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটি হবে প্রথম চীন সফর। এই সফর মূলত মার্চের শেষ দিকে হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ইরান সংশ্লিষ্ট চলমান সংঘাতের কারণে তা পিছিয়ে যায়।
বৈঠকটি বিশ্ব রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ট্রাম্প প্রায়ই শি জিনপিংকে ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু’ বলে উল্লেখ করলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি বন্ধুত্বের বৈঠক নয়; বরং উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের একটি প্রচেষ্টা। তাইওয়ান ইস্যুতে বিশ্বের প্রভাবশালী এই দুই নেতার স্পষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে।
রয়টার্স বলছে, ট্রাম্পের অগ্রাধিকারকে তিনটি ‘টি’ দিয়ে সংক্ষেপ করা যায়: ট্রেড বা বাণিজ্য, তেহরান ও তাইওয়ান। অন্যদিকে, শি জিনপিংয়ের লক্ষ্যকে তিনটি ‘এস’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়: যা স্ট্যাবিলিটি বা স্থিতিশীলতা, স্ট্যাটাস বা মর্যাদা এবং সেন্স অন তাইওয়ান বা তাইওয়ান ইস্যুতে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানকে বোঝায়।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য সমাধান বা শুল্কযুদ্ধের অবসান এখনই হবে– এমন সম্ভাবনা কম। বৈদ্যুতিক গাড়ি, উন্নত প্রযুক্তি এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপ নিয়ে প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি রূপ নিতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এই শীর্ষ বৈঠক থেকে বড় কোনো অগ্রগতি আসবে কি না সন্দেহ রয়েছে। বরং সীমিত ও প্রতীকী কিছু সমঝোতা বা উত্তেজনা কমানোর মতো বিবৃতি আসতে পারে।
এদিকে, দুই শীর্ষ নেতার সম্ভাব্য বৈঠক তাইওয়ানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির সরকার ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্টরা ট্রাম্প–শি বৈঠকের দিকে নজর রাখছে, যা দ্বীপটির নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ যেখানে বৃহৎ শক্তিগুলোর আলোচনা তাইওয়ানের ভবিষ্যৎকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাম্পের চীন সফরকে সামনে রেখে তাইওয়ানের বেসামরিক নাগরিকদের আত্মরক্ষা প্রশিক্ষণ ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে বৈকি।