কেন নিজেদেরই ফুসফুস পোড়াচ্ছে চীন?

২০১২ সালের এক বসন্তে বেইজিংয়ে এক হাই-প্রোফাইল বৈঠকে মুখোমুখি হন বিশ্বের অন্যতম ধনী বিল গেটস ও চীনের তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। বৈঠক শেষে তারা যখন বের হচ্ছিলেন, তখন আলোচনার বিষয়বস্তু কী ছিল জানেন? না, রাজনীতি বা অর্থনীতি নয়, ধূমপান। শি সে সময় প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, চীনের তামাক মহামারি নিয়ন্ত্রণে তিনি কিছু একটা করবেন। কিন্তু আজ ১৪ বছর পর, সেই প্রতিজ্ঞা কি রাখতে পেরেছেন শি? তিনি এখন চীনের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী শাসক, কিন্তু তামাকের কাছে তিনি কি পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেছেন? চীনেই কেন পুড়ছে বিশ্বের অর্ধেক সিগারেট? আজ আমরা এটাই আলোচনা করব।

কেন উল্টো রথে চীন

আপনি যদি চীনের পরিসংখ্যান শোনেন, চোখ কপালে উঠবেই। পরিসংখ্যান বলছে, গত ২০ বছরে সারা বিশ্বে সিগারেটের বিক্রি কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। কিন্তু চীন চলেছে উল্টো রথে। এখানে বিক্রি বেড়েছে ৩৯ শতাংশ। চীনে প্রতি বছর প্রায় ২.৪০ লাখ কোটি সিগারেট বিক্রি হয়। সহজ ভাষায়, গোটা পৃথিবীতে যত সিগারেট তৈরি হয়, তার অর্ধেকই পুড়ছে এই এক দেশে। তরুণদের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা এলেও, সামগ্রিকভাবে সিগারেটের বাজার এখন আকাশচুম্বী। এর বড় কারণ হলো, চীনে সিগারেট অত্যন্ত সস্তা। এক প্যাকেট সিগারেটের গড় দাম মাত্র ৩ ডলার, যা আমেরিকার তুলনায় তিন ভাগের এক ভাগ। কিন্তু এই ব্যর্থতার পেছনে কি শুধুই মানুষের অভ্যাস, নাকি পর্দার আড়ালে আছে বড় কোনো চক্র?

পর্দার আড়ালে কী?

চীনের এই তামাক সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে স্টেট টোব্যাকো মনোপলি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন। আর এদেরই অধীনে চলে বিশ্বের বৃহত্তম তামাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, চায়না ন্যাশনাল টোব্যাকো করপোরেশন। ২০২৫ সালে এই একটিমাত্র কোম্পানির মুনাফা ও কর রাজস্বের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৪৪ বিলিয়ন ডলার! অবিশ্বাস্য শোনালেও, এই বিপুল অর্থ চীনের সামগ্রিক জাতীয় রাজস্বের প্রায় ৭ শতাংশ। এটি চীনের ঘোষিত মোট প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় সমান! বর্তমান চীনের আবাসন খাতে চলছে চরম মন্দা। জমি বিক্রি থেকে স্থানীয় সরকারগুলোর আয় প্রায় বন্ধ। তার ওপর করোনা মহামারির সময় গণহারে কোভিড টেস্ট করতে গিয়ে স্থানীয় সরকারগুলো দেউলিয়া হওয়ার পথে। এই চরম অর্থনৈতিক সংকটে চীনের উদ্ধারকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে এই তামাকের টাকা। শুধু তাই নয়, শি জিনপিংয়ের ড্রিম প্রজেক্ট—যেমন চীনের নিজস্ব সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ বানানোর ১০০ বিলিয়ন ডলারের ফান্ড, কিংবা সংকটে পড়া বড় বড় ব্যাংকে অর্থ জোগান দেওয়া, সবখানেই তামাক থেকে পাওয়া এই মুনাফা ব্যবহার হচ্ছে।

নখদন্তহীন আইন

এই বিপুল টাকার জোরে তামাক সংস্থাটির রাজনৈতিক প্রভাবও আকাশচুম্বী। এই প্রতিষ্ঠানের যিনি প্রধান হন তিনি একজন উপমন্ত্রীর মর্যাদা পান। গত ৭ বছরে দুর্নীতির দায়ে এদের ৭ জন শীর্ষ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার হয়েছেন। তবুও প্রভাব কমেনি। ২০১৭ সালে তারা পুরো চীনে চার দেয়ালের ভেতর ধূমপান নিষিদ্ধ করার আইনকে সফলভাবে রুখে দেয়। আইন করার ক্ষমতা ঠেলে দেওয়া হয় স্থানীয় সরকারগুলোর দিকে, যারা তামাকের ট্যাক্সের ওপর বেঁচে আছে। আমেরিকার সিগারেটের প্যাকেটে যেখানে ক্যানসারের ভয়ংকর ছবি থাকে, সেখানে চীনের প্যাকেটে শোভা পায় জাতীয় প্রতীক ‘পান্ডা’ কিংবা ‘গেট অব হেভেনলি পিস’-এর সুন্দর ছবি। পাশে এক লাইনে নামমাত্র সতর্কবার্তা! চীনা সিডিসি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, সরকারের এই দুইমুখী মনোভাবের কারণেই দেশটিতে ধূমপান নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

জনগণের প্রতিরোধ

অবশ্য সরকারের এই নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে এখন ফুঁসে উঠছে চীনের তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে নারীরা। ২৩ বছর বয়সি ইনফ্লুয়েন্সার আলভা ঝাং উইচ্যাটে একটি গ্রুপ তৈরি করেছেন, যেখানে প্রকাশ্যে ধূমপায়ীদের হাতেনাতে ধরে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আলভা জানিয়েছেন, আইন থাকলেও শাস্তি নেই, তাই নিজেদেরই লড়তে হবে। অতি সম্প্রতি এক নারী স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান বেপরোয়া ধূমপায়ীদের ব্যঙ্গ করে শো করার পর তা দেশজুড়ে ভাইরাল হয়। চীনের সাধারণ মানুষও এখন কঠোর আইনের দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হচ্ছেন।

ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতে শি জিনপিং সরকারি কর্মকর্তাদের প্রকাশ্যে ধূমপান নিষিদ্ধ করে আশা জাগিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে ট্যাক্স বাড়িয়ে সিগারেটের দাম ১০ শতাংশ বাড়ানোও হয়েছিল। কিন্তু তামাক লবির কাছে শেষ পর্যন্ত সেই জোয়ার থেমে যায়। এমনকি বন্ধ হয়ে যায় ফার্স্ট লেডির ধূমপানবিরোধী প্রচারণা। চীনের অফিশিয়াল লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ধূমপায়ীর হার ২৩ থেকে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা। কিন্তু সরকারেরই শীর্ষ কর্মকর্তা উ জিয়াংতিয়ান সম্প্রতি জানিয়েছেন, এই লক্ষ্য পূরণ অত্যন্ত কঠিন। শি জিনপিং নিজে বিষাক্ত ধোঁয়া ছেড়ে সুস্থ হয়েছেন ঠিকই, কিন্তু চীনের কোটি কোটি মানুষকে তামাকের এই মরণফাঁদ থেকে মুক্ত করার চাবিকাঠি কি আদৌ তার হাতে আছে? নাকি অর্থনীতি বাঁচানোর স্বার্থে তামাকের ধোঁয়ায় নিজেদের ফুসফুসকে এভাবেই পুড়তে দেবে চীন?