ফের কেন আলোচনায় পুশ-ইন, সীমান্তে আসলে কী হচ্ছে?

সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ী সীমান্তে ভারতের বিএসএফ জোয়ানরা হঠাৎ করেই ২৮ জন মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু বিজিবির বাধায় দলটি বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পেরে খোলা আকাশের নিচে কাটায় প্রায় দুদিন। শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জই নয়, সাতক্ষীরার হাকিমপুর কিংবা যশোরের বেনাপোল সীমান্তেও একই ঘটনা দেখা গেছে। কিন্তু হঠাৎ এই পরিস্থিতি কেন? সীমান্তে আসলে কী হচ্ছে? আজকে আমরা এ বিষয়টিই বোঝার চেষ্টা করব।

সীমান্তে আসলে কী হচ্ছে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাঙ্গাবাড়ীতে যে ২৮ জনকে পুশ-ইনের চেষ্টা করা হয়েছিল, তাদের নিয়ে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে দুই দফা পতাকা বৈঠক হয়। বিজিবি স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, রাতের আঁধারে কাউকেই পুশ-ইন করতে দেওয়া হবে না। দলটিতে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক থাকলে, দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সিদ্ধান্ত নেবে। বিজিবির অনড় অবস্থানের কারণে পরবর্তীতে বিএসএফ ওই ২৮ জনকে শূন্যরেখা থেকে তাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

কিছুদিন আগে একই চিত্র দেখা যায় যশোরের বেনাপোল সংলগ্ন রঘুনাথপুর সীমান্তেও। সেখানে গভীর রাতে প্রায় ১৫ জনের একটি দলকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবি জানায়, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০০ জনকে ওপারে জড়ো করা হয়েছিল। কিন্তু বিজিবি সতর্ক থাকায় কেউ জিরো লাইন ক্রস করতে পারেনি। সীমান্তের ওপারে নো-ম্যানস ল্যান্ডের কাছাকাছি এখনো তাদের ফেলে যাওয়া জিনিসপত্র পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে।

ওপারের পরিস্থিতি কী?

এ তো গেল বাংলাদেশ অংশের কথা। এখন প্রশ্ন হলো, সীমান্তের ওপারে ঠিক কী হচ্ছে? গত সপ্তাহে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ভারতের হাকিমপুর সীমান্তে ‘বাংলাদেশি’ নাগরিক পরিচয়ে শত শত মানুষ জড়ো হচ্ছেন। সেখানকার কিছু পরিত্যক্ত ঘরে পরিবারসহ তাদের অপেক্ষা করতে বলা হচ্ছে, যাতে তারা বাংলাদেশে চলে আসেন। বিবিসি জানায়, ভারতের পুলিশ কর্মীরা তাদের ডেকে এনে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা নথিপত্র যাচাই করতে দেখা গেছে। এরপর তাদের বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয় স্বরূপনগর থানা এলাকায় বিশেষভাবে গড়ে তোলা আটক শিবিরে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, ইতোমধ্যে অনেককেই নাকি বিভিন্ন পকেট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোও হয়েছে।

হঠাৎ করে এ পরিস্থিতি কেন?

প্রশ্ন উঠছে, হঠাৎ করে কেন এই ধরপাকড় আর পুশ-ইনের হিড়িক? এর পেছনে রয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। এ মাসের শুরুর দিকে পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টি–বিজেপি সরকার গঠন করে। নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দায়িত্ব নেওয়ার পরই এক বড় ঘোষণা দেন। তিনি জানান, পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বাস করা বাংলাদেশিদের আর থাকতে দেওয়া হবে না। একই সাথে তাদের চিহ্নিত করে আটকে রাখার জন্য আটক কেন্দ্র তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই সীমান্তজুড়ে কথিত বাংলাদেশিদের পুশ-ইন করার তৎপরতা হঠাৎ এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ কী বলছে?

ভারতের ওপারে যখন এত বড় তোড়জোড়, তখন বাংলাদেশ প্রান্তে প্রশাসনের বক্তব্য কী? সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান এবং সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ দুজনেই গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পুশ-ইনের চেষ্টা করা হলেও বিজিবির কড়া নজরদারির কারণে তা সফল হয়নি। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে বা গোপনে কাউকে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করার দাবিও তারা নাকচ করে দিয়েছেন। একইভাবে যশোর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং চুয়াডাঙ্গার পুলিশ ও জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকা এখন পর্যন্ত শান্ত ও স্বাভাবিকই আছে।

অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেছেন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যদি জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাইয়ের মাধ্যমে কোনো তালিকা পাঠায়, তবে আইন অনুযায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। তবে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি। যেকোনো ধরনের অবৈধ পুশ-ইনের বিপক্ষে বাংলাদেশ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পুশ-ইন কিংবা সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বরাবরই এক বড় অস্বস্তির কারণ। খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট থেকে শুরু করে এখন যশোর-সাতক্ষীরা সীমান্তেও এই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে। একদিকে ওপারে রাজ্য সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা, অন্যদিকে এপারে বিজিবির কঠোর সুরক্ষাব্যূহ—এই দুইয়ের মাঝে সীমান্তে মানবিক সংকট আরও তীব্র হবে কিনা, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।