তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে কেন এত আলোচনা?

নদীর বুকে গড়ে উঠবে চোখধাঁধানো আধুনিক স্যাটেলাইট শহর, পাঁচতারকা হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত শক্তিশালী বাঁধ। উত্তরবঙ্গের ভাগ্য পুরোপুরি বদলে দিতে এই রূপরেখার নাম ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’। কিন্তু আপাতদৃষ্টে সাধারণ একটা নদী শাসন প্রকল্প নিয়ে কেন ভূরাজনীতিতে এত তোলপাড়? কেন এশিয়ার দুই পারমাণবিক শক্তিধর পরাশক্তি—চীন আর ভারত এই প্রকল্পের পেছনে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে? কী এমন আছে এই মহাপরিকল্পনায়, যা বাংলাদেশের কূটনীতি আর ভূরাজনীতিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে? আজ একদম সহজ ভাষায় আমরা বুঝব তিস্তা মহাপরিকল্পনার আসল জট।

কেন এই মহাপরিকল্পনা?

মহাপরিকল্পনাটি কেন দরকার, সেটা বুঝতে হলে আগে তিস্তাপাড়ের মানুষের বছরের পর বছরের কান্নাটা বুঝতে হবে। তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। হিমালয় থেকে নেমে ভারতের সিকিম আর পশ্চিমবঙ্গ হয়ে এটি বাংলাদেশে ঢুকেছে। সমস্যা হলো, ভারত এই নদীর ওপর একাধিক বাঁধ দিয়ে রেখেছে। এর ফলে একটি অদ্ভুত মরণফাঁদ তৈরি হয়েছে। প্রতিবছর যখন শুষ্ক মৌসুম আসে, যখন আমাদের ফসলের মাঠে পানির ভীষণ দরকার, তখন ভারত বাঁধের সব গেট বন্ধ করে পানি আটকে রাখে। তিস্তা তখন হয়ে যায় মরুভূমি। আবার যখন বর্ষাকাল আসে, যখন অলরেডি আমাদের এখানে বৃষ্টি হচ্ছে, তখন ভারত তাদের বাঁধের ওপর চাপ কমাতে একসঙ্গে সবগুলো ব্যারেজ খুলে দেয়! ব্যস, মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলের মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়, শুরু হয় তীব্র নদীভাঙন। অর্থাৎ—শুষ্কে এক ফোঁটা পানি নেই, আর বর্ষায় ডুবিয়ে মারা! এই চিরস্থায়ী সংকট থেকে বাঁচতেই বাংলাদেশ সরকার হাতে নেয় ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’ বা তিস্তা মহাপরিকল্পনা।

কী আছে এই মহাপরিকল্পনায়?

তাহলে এই মহাপরিকল্পনায় আসলে কী করা হবে? এটি মূলত প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রজেক্ট। এর মূল লক্ষ্য হলো তিস্তা নদীকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে ভারতের পানির ওপর আমাদের নির্ভরতা অনেকটাই কমে যায়। চলুন দেখা যাক, এই পরিকল্পনার ভেতরে কী কী আছে।

প্রথমে নদী খনন বা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে তিস্তা নদীর প্রায় ১০২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে গভীরতা বাড়ানো হবে। এতে নদী অনেক বেশি পানি ধরে রাখতে পারবে, ফলে বর্ষাকালে হুট করে বন্যা হবেনা। এরপর নদী শাসনের মাধ্যমে তিস্তার দুই তীরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ও শক্তিশালী গাইড বাঁধ দেওয়া হবে। এর ফলে নদীভাঙন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর নদীকে একটা নির্দিষ্ট সীমানায় এনে প্রায় ১৭১ বর্গকিলোমিটার জমি উদ্ধার করা হবে। আর শেষে এই উদ্ধার হওয়া জমিতে তৈরি হবে আধুনিক স্যাটেলাইট টাউন, ফাইভ স্টার হোটেল, রিসোর্ট এবং বিনোদনকেন্দ্র। এছাড়া থাকবে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি বিশাল সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট এবং কলকারখানা। ভাবা যায়? যে তিস্তা নদী এখন উত্তরবঙ্গের মানুষের দুঃখ, এই প্রজেক্ট সফল হলে সেই তিস্তাই হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ইঞ্জিন!

কেন এটি নিয়ে এত আলোচনা?

তাহলে তো দারুণ কথা! বাংলাদেশ নিজের টাকায় বা ঋণে এই প্রকল্প করবে, এখানে এত আলোচনার কী আছে? আসল টুইস্টটা এখানেই। প্রজেক্টের ড্রাফট তৈরি হওয়ার পর থেকেই চীন এতে অর্থায়ন এবং কারিগরি সহায়তা দিতে ব্যাপক আগ্রহ দেখায়। চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানি প্রায় ৩ বছর ধরে বাংলাদেশে সমীক্ষাও চালায়। কিন্তু চীন যখনই টাকা নিয়ে প্রস্তুত, তখনই তীব্র আপত্তি তোলে ভারত। দিল্লির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। কারণ কী? কারণ হলো ভূরাজনীতি। তিস্তা নদীর অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেনস নেকের খুব কাছে। এই চিকেনস নেক হলো ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে তার উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে যুক্ত করার একমাত্র চিকন পথ। ভারত ভয় পাচ্ছে, চীন যদি তিস্তা প্রজেক্টের উসিলায় উত্তরবঙ্গের এই অঞ্চলে এসে বছরের পর বছর কাজ করে, তবে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে পড়বে।

তাছাড়া, চীনের বিশ্বব্যাপী একটি প্রজেক্ট আছে—‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’। এর অধীনে তারা বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করতে চায়। তিস্তা প্রজেক্টে ঢুকতে পারলে চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে সরাসরি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত পর্যন্ত তাদের প্রভাব বাড়ানো সহজ হবে। আর এই কারণে চীনকে ঠেকাতে ২০২৪ সালে ভারত নিজেই প্রস্তাব দিয়ে বসে—‘চীনের দরকার নেই, প্রজেক্টের টাকা এবং কাজ আমরাই করব!’ আর এই দুই পরাশক্তির টানাটানির কারণেই তিস্তা এখন টক অব দ্য রিজিয়ন!

বর্তমান বাস্তবতা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ধারণা করা হচ্ছিল, শেখ হাসিনা ভারতের সাথে সুসম্পর্কের কারণে প্রজেক্টটি ভারতকেই দিয়ে দেবেন। তিনি নিজেও তেমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটলে দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে যায়। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৫ সালের মার্চে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীন সফরে যান। তখন সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয় যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি চীনের মাধ্যমেই বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে বিএনপিও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা ক্ষমতায় গেলে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। এই পরিস্থিতির মধ্যে চীন সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর সফরেও তিস্তা প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানা গেছে।

তবে তিস্তাপাড়ের সাধারণ মানুষ এবং আন্দোলনকারীদের মনে এখনও একটাই প্রশ্ন—নদীর ভেতরের এই মহাপরিকল্পনা তখনই সফল হবে, যখন ভারত থেকে আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা পাওয়া যাবে। নদীতে যদি পানিই না থাকে, তবে ব্যারেজ আর আধুনিক শহর দিয়ে কী হবে? যদিও সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকারের পরিবর্তন হয়েছে। ফলে তিস্তার পানি চুক্তি নিয়েও একটা নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।