জিডিআইয়ে যুক্ত হয়ে চীনের আরও কাছে বাংলাদেশ?

বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরআইয়ের ঠিক ১০ বছর পর, চীনের আরও একটি বৈশ্বিক উদ্যোগে শামিল হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেই এ ঘোষণা আসতে পারে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ বা জিডিআইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় ঢাকা। কিন্তু কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত? আর এর মাধ্যমে কি বেইজিংয়ের আরও কাছে যাচ্ছে ঢাকা?

প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে যা যা হচ্ছে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিং সফর করছেন। আজ বুধবার চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠকের কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এই বৈঠকেই চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৭টি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক ও অ্যাকশন প্ল্যান সই হতে যাচ্ছে। এই ১৭টি নথির মধ্যে একটিতে রয়েছে জিডিআইতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির সমঝোতার নথি। বাংলাদেশ কিন্তু হুট করেই চীনের এ উদ্যোগে যুক্ত হয়নি। ২০২১ সালে শি জিনপিং যখন প্রথম জিডিআইয়ের ঘোষণা করেন, তখন থেকেই বাংলাদেশকে এতে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দিয়ে রাখে বেইজিং। গত কয়েক বছরে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিটা বৈঠকেই চীন এই প্রস্তাব টেবিলে তুলেছে। পররাষ্ট্রসচিব জানিয়েছেন, শি জিনপিংয়ের এই নতুন চিন্তাকে ঢাকা স্বাগত জানায়।

জিডিআই আসলে কী?

এখন প্রশ্ন হলো, এই জিডিআই আসলে কী? এটা কি কোনো সামরিক জোট? চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, জাতিসংঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি অর্জনে এটি একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম। সহজ ভাষায়, মূলত ৬টি ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করবে এই উদ্যোগ। এগুলো হলো—দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা, মহামারি মোকাবিলা, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। চীন বলছে, এটা কোনো যুদ্ধের জোট নয়, বরং একটি ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম। এরই মধ্যে এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে জাতিসংঘভুক্ত ৮০টিরও বেশি রাষ্ট্র।

বাংলাদেশ কেন এই উদ্যোগে?

বাংলাদেশের এই উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার কারণ কী? এর পেছনে রয়েছে নিখাদ অর্থনৈতিক লেনদেন।

    প্রথমত: ২০২৬ সালের এলডিসি সংকট। এ বছরই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করছে। আর এর মানেই হলো, বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের মতো সংস্থাগুলো আগের মতো সস্তায় ঋণ বা উন্নয়ন অর্থায়ন দেবে না। তাই এলডিসি উত্তরণের পর দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে বড় তহবিল, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য চীনের এই জিডিআই হবে ঢাকার নতুন লাইফলাইন।

    দ্বিতীয়ত: বিআরআইয়ের পরিপূরক। বাংলাদেশ আগে থেকেইচীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে বলেছেন, জিডিআই মূলত ওই প্রকল্পেরই পরিপূরক। তাই নতুন করে এতে যোগ দিতে ঢাকার কোনো আইনি বা রাজনৈতিক বাধা নেই।

ঢাকার কূটনৈতিক চাল

কিন্তু কথা হলো, ভূরাজনীতিতে 'ফ্রি লাঞ্চ' বলে কোনো শব্দ নেই। আসলে শি জিনপিংয়ের বৈশ্বিক উদ্যোগের সংখ্যা ৪টি। ডেভেলপমেন্টের জন্য জিডিআই, নিরাপত্তার জন্য জিএসআই, সিভিলাইজেশনের জন্য জিসিআই এবং গ্লোবাল গভর্নেন্সের জন্য জিজিআই। এখানেই বাংলাদেশ দিয়েছে এক মোক্ষম কূটনৈতিক চাল। আমেরিকা ও ভারতের বুক কেঁপে ওঠে যখন চীন তার জিএসআই নিয়ে কথা বলে। এর কারণ ওটা সরাসরি সামরিক ও নিরাপত্তা জোট। ঢাকা খুব ভালো করেই জানে, জিএসআইতে পা দেওয়া মানেই ওয়াশিংটন আর দিল্লির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করা। তাই বাংলাদেশ আপাতত বাকি ৩টি উদ্যোগকে দূরে সরিয়ে রেখে, ব্যবসায়িক প্রকল্পটিকে আপন করে নিচ্ছে। নিরাপত্তা ও রাজনীতি থেকে উন্নয়নকে সম্পূর্ণ আলাদা রেখে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির এক মাস্টারস্ট্রোক দিচ্ছে ঢাকা!

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জিডিআইয়ে যুক্ত হলে ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক যে এক নতুন উচ্চতায় যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ধারালো তরবারির ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে ঢাকাকে। একদিকে অর্থনৈতিক উত্তরণ, অন্যদিকে পরাশক্তিদের ভারসাম্য রক্ষা—বাংলাদেশ কি পারবে এই খেলায় নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে?

ডাউনলোডযোগ্য পিডিএফ ফাইলে এই সম্পূর্ণ প্রতিবেদনটি সুন্দর ফন্ট এবং একটি প্রফেশনাল নিউজ রিপোর্টের লেআউটে সাজানো রয়েছে। পরবর্তী যেকোনো প্রতিবেদনের জন্য একইভাবে ডেটা প্রস্তুত করে দেওয়া হবে।