প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ মানুষের করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার জন্য অর্থমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর অর্থ হলো, বছরে ৪ লাখ টাকার কম আয় করেন, এমন ব্যক্তিকে কোনো আয়কর দিতে হবে না। এখন প্রশ্ন হলো, করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা হলে সাধারণ মানুষের সুবিধা, নাকি অসুবিধা? এ বিষয়টি নিয়েই আজকের আলোচনা।
করমুক্ত আয়সীমা কী
সহজ ভাষায়, করমুক্ত আয়সীমা হলো—বছরে ঠিক কত টাকা পর্যন্ত আয় করলে সরকারকে এক টাকাও কর (ট্যাক্স) দিতে হবে না। ধরা যাক, বর্তমানে এ সীমা যদি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হয়, তার মানে বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার ১ টাকা বেশি আয় করলেই আপনাকে করের আওতায় আসতে হবে। এখন প্রধানমন্ত্রী যখন একে ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দিচ্ছেন, তখন মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্তের মুখে চওড়া হাসি ফুটতেই পারে। কারণ, বর্তমান বাজারে যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়ছে, তাতে বছরে ৪ লাখ টাকা আয় করা একজন মানুষের জন্য সংসার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে সরকারকে কর দেওয়াটা ছিল এক বড় বোঝা। প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান যদি অর্থমন্ত্রী পাস করেন, তবে কোটি মানুষের পকেটে সরাসরি স্বস্তি ফিরবে।
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ হলে সুবিধা কী?
চলুন হিসাব করি, এতে সাধারণ মানুষ কী কী সুবিধা পাবে। প্রথমেই সরাসরি করের বোঝা কমবে। করমুক্ত সীমা ৪ লাখ টাকা হলে, যাদের বার্ষিক আয় এর নিচে বা কাছাকাছি, তাদের আর কর দিতে হবে না। ফলে প্রতি মাসে তাদের পকেটে যে টাকা বাঁচবে, তা দিয়ে তারা সংসারের খরচ, সন্তানের পড়াশোনা বা চিকিৎসা খরচ মেটাতে পারবেন। এর ফলে বাজারে কেনাকাটা ও নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে। মানুষের হাতে যখন বাড়তি টাকা থাকবে, তারা স্বাভাবিকভাবেই বাজারে খরচ করবে। এতে ব্যবসাবাণিজ্যে গতি আসবে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি আরও চাঙা হবে। আর এতে জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে। মোদ্দা কথা হলো, মূল্যস্ফীতির এ বাজারে এ বাড়তি ছাড় মধ্যবিত্তকে একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ দেবে।
অসুবিধা তাহলে কোথায়?
শুনতে তো দারুণ লাগছে, তাই না? কিন্তু অর্থনীতির একটি চিরন্তন নিয়ম আছে, ‘দেয়ার ইজ নো ফ্রি লাঞ্চ’ (বিনা মূল্যে কিছু মেলে না)। এক জায়গায় সুবিধা হলে, অন্য জায়গায় ধাক্কা লাগবেই। এবার দেখা যাক এর মূল অসুবিধাগুলো কী কী।
প্রথমত, সরকারের রাজস্ব আদায়ে ধাক্কা লাগবে। আমাদের দেশে প্রত্যক্ষ কর বা ডিরেক্ট ট্যাক্স দেওয়া মানুষের সংখ্যা এমনিতেই কম। আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করে দিলে বিশাল একটি জনগোষ্ঠী করের আওতার বাইরে চলে যাবে। ফলে সরকারের কোষাগারে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হবে।
রাজস্ব যদি কমে যায়, তাহলে সরকার মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নের জন্য টাকা পাবে কোথা থেকে? প্রধানমন্ত্রী বাজেট অধিবেশনে বলেছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা যেকোনো মূল্যে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ধরনের মেগা প্রকল্প করতে হাজার হাজার কোটি টাকা লাগে। সরকার যদি কর থেকে টাকা না পায়, তবে উন্নয়নকাজের জন্য সরকারকে হয় অভ্যন্তরীণ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে, না হয় বিদেশি ঋণ বাড়াতে হবে। এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক।
আয়কর থেকে আয় কমলে সরকার পরোক্ষ কর বা ভ্যাট বৃদ্ধির পথে হাঁটতে পারে। এতে তেল, লবণ, বিদ্যুৎ, গ্যাস বা নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট বাড়িয়ে দিতে পারে। আর ভ্যাট বাড়লে কিন্তু ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সবাইকে বেশি দামে জিনিস কিনতে হবে। অর্থাৎ, আয়করের ফাইলে যে টাকা বাঁচবে, বাজারের ভ্যাটে তার চেয়ে বেশি টাকা বেরিয়ে যেতে পারে! একদিকে জনগণের মন জয়ের জন্য করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের কোটি মানুষের ভাগ্যবদলের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনার চ্যালেঞ্জ। এ দুইয়ের ভারসাম্য অর্থমন্ত্রী কীভাবে রক্ষা করেন—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তাহলে চূড়ান্ত সমীকরণ কী দাঁড়াল? করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করা সাধারণ মানুষের জন্য তাৎক্ষণিক ‘লাইফ সেভার’ বা স্বস্তির খবর হলেও, সরকারের জন্য এটি একটি বিশাল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। করের হার না বাড়িয়েও যদি সরকার করের আওতা বাড়াতে পারে এবং ধনীদের কাছ থেকে ঠিকঠাক কর আদায় করতে পারে, তবেই এ সিদ্ধান্ত সফল হবে।