রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেছেন। শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিনের কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দেন। পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে– যদি একজন রাষ্ট্রপতি মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন, তাহলে নতুন রাষ্ট্রপতি কীভাবে নির্বাচিত হবেন? ভোট দেবেন কারা? নির্বাচন কবে হবে? আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় সংবিধান কী বলছে? আজকের ভিডিওতে সহজভাবে জানিয়ে দিচ্ছি পুরো বিষয়টি।
রাষ্ট্রপতির মেয়াদ কতদিন?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। একই ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতে পারেন। তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেও রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হতে পারে। সংবিধানে তিনটি পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমত, পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হলে। দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে। আর তৃতীয়ত, অভিশংসন বা সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় অপসারণ করা হলে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সংবিধান অনুযায়ী তাঁর মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত থাকার কথা। তবে যদি তিনি যেহতু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেছেন, সুতরাং সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হবে এবং নতুন নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত স্পিকারই অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দেন কারা, এ প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে আসতে পারে। বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ সরাসরি ভোট দেন না। সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে। অর্থাৎ, সংসদ সদস্যরাই এই নির্বাচনের ভোটার। রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হতে হলে তাঁর বয়স কমপক্ষে ৩৫ বছর হতে হবে এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা থাকতে হবে। মনোনয়নপত্রে একজন সংসদ সদস্য প্রস্তাবক এবং আরেকজন সমর্থক হিসেবে স্বাক্ষর করবেন। যদি একজন বৈধ প্রার্থীই থাকেন, তাহলে ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয় না। তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। আর একাধিক প্রার্থী থাকলে সংসদ সদস্যদের ভোটে বিজয়ী নির্ধারিত হবে।
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে নতুন নির্বাচন কবে হবে?
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুরু হয়। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যেই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, পদ শূন্য হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শুরু করা হবে। আর নির্বাচন পরিচালনা করবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার, যিনি নির্বাচনী কর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ অধিবেশন চললে সেখানেই ভোট হবে। আর সংসদ অধিবেশন না থাকলে প্রয়োজন হলে বিশেষ বৈঠক বা অধিবেশন আহ্বান করে নির্বাচন আয়োজন করা হবে।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য থাকলে দায়িত্বে থাকবেন কে?
অনেকের ধারণা, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে শূন্যতা তৈরি হবে। কিন্তু সংবিধান এ বিষয়েও স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে অথবা তিনি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে দায়িত্ব পালন করতে না পারলে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
অন্যদিকে শারীরিক বা মানসিক অসামর্থ্যের কারণে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের ক্ষেত্রেও সংবিধানে পৃথক প্রক্রিয়া রয়েছে। সেখানে সংসদের প্রস্তাব, চিকিৎসা পর্ষদের মতামত এবং দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের বিধান রয়েছে। একইভাবে অভিশংসনের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
রাষ্ট্রপতির পদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা সীমিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে হয়। এজন্য অনেকেই রাষ্ট্রপতির পদকে মূলত সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে রাজনৈতিক সংকট, সরকার গঠন, সংসদ-সংক্রান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত কিংবা বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। এদিকে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনার বিষয়ে বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। যদিও এসব পরিবর্তন কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হবে।
সব মিলিয়ে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের আলোচনা যতই জোরালো হোক না কেন, পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হবে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে সংসদ সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন, আর নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে ৯০ দিনের মধ্যে। ততদিন পর্যন্ত সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন স্পিকার। তাই রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি সাংবিধানিক বিধান জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি ধাপই নির্ধারিত হয় সংবিধানের কাঠামো অনুসারে।