বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেলের রুটগুলোতে আগুন জ্বলছে। হরমুজ প্রণালীর পর এবার অবরুদ্ধ হতে চলেছে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালী। বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান এই রক্তনালী বাঁচাতে এবার মধ্যপ্রাচ্যে এক বিশাল নৌ সামরিক জোট গঠনের ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, তুরস্কসহ মোট ১৪টি দেশ মিলে তৈরি হচ্ছে এই বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোট–মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স। কিন্তু কেন হঠাৎ তড়িঘড়ি করে এই জোট? আর এই জোটে আমেরিকা বা আমিরাতের মতো দেশের অবস্থানই-বা কী?
হঠাৎ কেন এই সামরিক জোট?
ঘটনার শুরু গত ২০ জুলাই। ইরানের মদদপুষ্ট ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের ওপর এক নজিরবিহীন সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালী যখন বন্ধের মুখে, তখন সৌদি আরব তাদের বেশিরভাগ জ্বালানি তেল সমুদ্রপথে পাঠাতে ব্যবহার করছিল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর। কিন্তু হুতিদের ড্রোন আর ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে সেই পথও এখন অবরুদ্ধ।
সম্প্রতি হুতিদের হামলার মুখে পড়ে ‘এনসিসি গাজাল’ নামের একটি বিশাল সৌদি তেলবাহী জাহাজ। পরে তা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়। শুধু তা-ই নয়, সমুদ্র দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ গেলেই নাকি এখন চাঁদা বা ‘টোল’ দিতে হবে হুতিদের। আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন অনুযায়ী এমন টোল আদায় পুরোপুরি অবৈধ হলেও ইরান ও হুতিরা মূলত এই কৌশলই নিচ্ছে। ঠিক এই কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের সমুদ্রপথ বাঁচাতে সৌদি আরব ৫০টির বেশি দেশকে আমন্ত্রণ জানায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৪টি দেশকে সঙ্গে নিয়ে এই বিশাল প্রতিরক্ষা জোট গঠন করেছে।
কারা আছে এই জোটে, আর কারা নেই?
এই জোটের প্রধান চালিকাশক্তি এবং সদর দপ্তর হচ্ছে রিয়াদ। জোটে সই করা ১৪টি দেশ হলো—সৌদি আরব, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিশর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইয়েমেন, সুদান এবং কোমোরোস। আমন্ত্রিত ৫১টির মধ্যে ৪৩টি দেশ এই জোট গঠনসংক্রান্ত বৈঠকে অংশ নেয়। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নও এতে উপস্থিত ছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ—সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ওমান কিন্তু এই চুক্তিতে সই করেনি। নিরাপত্তা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও আঞ্চলিক রাজনীতি ও কৌশলের কারণে তারা আপাতত দূরত্ব বজায় রেখেছে। তাহলে আমেরিকা কোথায়? যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরাসরি কাগজে-কলমে সই না করলেও খুব জলদিই এই জোটে সমর্থন বা যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সাথে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি পরিষ্কার জানিয়েছেন, ইরানের ওপর যুদ্ধে সৌদি সমর্থন নেই, তবে নিজেদের রক্ষা করতে রিয়াদ পুরোপুরি প্রস্তুত। এমনকি হুতিদের সামলানো যে সৌদির নিজস্ব ব্যাপার, সেটাও তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিয়েছেন।
বাব আল-মান্দেব কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
হয়তো ভাবছেন, এই সরু সমুদ্রপথ নিয়ে কেন এত কাড়াকাড়ি? লোহিত সাগর হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের হৃৎপিণ্ড। বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ সামুদ্রিক জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে। আর এর মূল গেটওয়ে হলো বাব আল-মান্দেব প্রণালী। এটি মাত্র ২৯ কিলোমিটার চওড়া একটি অত্যন্ত সরু সমুদ্রপথ। সমুদ্রের সামান্য এই পথটুকু দিয়েই ২০২৪ সালে দিনে ৪.১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল ও জ্বালানি পরিবাহিত হয়েছে। শান্তির সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ সরবরাহ হতো হরমুজ প্রণালী দিয়ে। এখন সেই হরমুজ বন্ধ, তার ওপর বাব আল-মান্দেবও অশান্ত। ফল কী? বিশ্বের প্রায় ২৫ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ এখন মারাত্মক ঝুঁকিতে!
যেখানে আগে দিনে ৭০টির বেশি জাহাজ এই প্রণালী পার হতো, হুতিদের হামলার ভয়ে তা নেমে এসেছে হাতে গোনা কয়েকটি জাহাজে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম হু হু করে বেড়ে গিয়ে সেঞ্চুরি পার করে ফেলেছে! যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আপনার-আমার পকেটে ও নিত্যপণ্যের দামে।
নৌ সামরিক জোট কী বার্তা দিচ্ছে?
এখন প্রশ্ন হলো, এই নতুন জোট আসলে করবেটা কী? সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাষ্যমতে, এটি কোনো দেশকে আক্রমণ করার জন্য গঠিত হয়নি, এটি একটি আত্মরক্ষামূলক জোট। জোটভুক্ত দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর চেয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে নিরাপত্তা দেবে।
প্রথমত: সমুদ্রসীমায় যৌথ নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান করা। দ্বিতীয়ত: কোনো জাহাজে হামলা হলে দ্রুত যৌথ অপারেশন চালানো। তৃতীয়ত: যৌথ সামরিক মহড়ার মাধ্যমে জলপথের ওপর সার্বভৌমত্ব ও প্রভাব বজায় রাখা।
এই জোট মূলত ইরান এবং ইয়েমেনের হুতিদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে—বিশ্বের বাণিজ্য রুটকে কোনো একটি গোষ্ঠী জিম্মি করতে পারবে না। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বড় বড় শক্তিগুলো এবার এক টেবিলে এসে নিজেদের অর্থনীতি রক্ষা করতে একাট্টা। লোহিত সাগরের এই উত্তেজনা এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির অস্তিত্বের লড়াই। বাংলাদেশসহ ১৪ দেশের এই সামরিক সমঝোতা কি পারবে তেলের দামের আগুন নেটাতে? নাকি ইরান-হুতি বনাম সৌদির এই বিরোধ গড়ায় নতুন কোনো বিশ্ব সংকটে?