তীব্র গ্যাস সংকটের কারণ কী, কত দিনে সমাধান?

চুলায় আগুন জ্বলছে না, সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন, আর গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ ও শিল্পকারখানার চাকা বন্ধের যোগাড়। দেশ যাচ্ছে এক তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্য দিয়ে। সাধারণ সময়ে দেশে দৈনিক ২,৬০০ থেকে ২,৭০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হলেও তা এখন নেমে এসেছে মাত্র ২,১৫০ মিলিয়নে! কিন্তু হুট করে কেন এই ভয়াবহ ধস? খুব দ্রুত কি এই সংকট থেকে মুক্তি মিলবে, নাকি সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় বিপদ?

হঠাৎ এ সংকট কেন?

চলমান এই গ্যাস সংকটের নেপথ্যে বেশ কয়েকটি তাৎক্ষণিক কারণ রয়েছে।

প্রথমত, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে যাওয়া। এটি মেরামতের কাজ শেষ পর্যায়ে হলেও কবে নাগাদ পুরোপুরি সচল হবে, তার সঠিক উত্তর পেট্রোবাংলাও দিতে পারছে না।

দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক আন্তর্জাতিক বাজার। স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম তরতর করে বেড়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যে এলএনজি প্রতি এমএমবিটিইউ ছিল ১০.৬০ ডলার, তা পাঁচ মাসের ব্যবধানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১.৪৫ ডলারের ওপরে! অর্থাৎ দাম দ্বিগুণেরও বেশি।

আর তৃতীয় বড় ধাক্কা, কাতার সংকট। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে যে এলএনজি আসত, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে সেখানে সাপ্লাই চেইন ব্যাহত হয়েছে। ফলে আগামী ৩-৪ বছর কাতারের চুক্তিকৃত এলএনজির প্রায় অর্ধেক কার্গো পাওয়া নিয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

দেশি উৎপাদনে বড় ধস

আমদানির ওপর নির্ভরতা তো গেল এক দিক, কিন্তু আমাদের নিজেদের গ্যাসের কী খবর? বাস্তবতা অত্যন্ত ভয়াবহ। দেশে প্রতিবছর ১৫ কোটি ঘনফুট স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। আমাদের মোট গ্যাসের ৫০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় মার্কিন কোম্পানি শেভরন। তাদের বিখ্যাত বিবিয়ানা ফিল্ড থেকেই গত চার মাসে প্রতিদিন প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে গেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও প্রতিবছর কমে যাচ্ছে ৩ কোটি ঘনফুট করে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক চাহিদা ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট, অথচ ঘাটতি থাকছে প্রায় ১,২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপুল এই ঘাটতি মেটাতে যে বাড়তি এলএনজি আমদানি করা দরকার, তা আনার মতো প্রয়োজনীয় অবকাঠামোই দেশে নেই!

অতীতের ভুল নীতি

প্রশ্ন হলো, আমরা হঠাৎ এক দিনে এই সংকটে পড়লাম কীভাবে? জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিগত দেড়-দুই দশকে দেশে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কোনো বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপই নেওয়া হয়নি। গ্যাসের সংকট হবে জেনেও বিগত সরকার বিষয়টি আমলে নেয়নি। তারা শুধু নামমাত্র ড্রিলিং ও এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভর করে হেঁটেছে। ২০২২ সালে ৫০টি নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত গ্যাস মেলেনি। পুরোনো জরিপের নথিপত্রে ছিল ভুলভাল তথ্য। ফলে অনুসন্ধানের অভাব আর আমদানিনির্ভর নীতি দেশকে এই ফাঁদে ফেলেছে।

সরকার কী করছে?

তাহলে এই সংকট উত্তরণে সরকার এখন কী করছে? পরিস্থিতি সামাল দিতে চায়না ন্যাশনাল এনার্জি কোম্পানিকে মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল তৈরির অনুমতি দেওয়া হয়েছে। আগামী ১৩ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্র থেকেও এলএনজি আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে সহায়তার আহ্বান জানিয়েছেন। তাৎক্ষণিক স্বস্তি দিতে আগামী অক্টোবরের মধ্যে মালয়েশিয়া থেকে বিশেষ ‘ক্রায়োজেনিক আইএসও ট্যাংক’ আনা হচ্ছে, যা দিয়ে এলএনজি পরিবহন করা সহজ হবে। এমনকি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এই প্রযুক্তির সাহায্যে ভোলার অতিরিক্ত গ্যাস ঢাকায় এনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট সতর্ক করছেন—এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কমপক্ষে ৩ থেকে ৪ বছর সময় লাগবে। ফলে আপাতত দ্রুত কোনো জাদুকরী সমাধান সরকারের হাতে নেই।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কী?

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিমের মতে, স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আনা বা শেভরনের নতুন প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া কিছুটা কাজে দিতে পারে। তবে একমাত্র স্থায়ী সমাধান হলো—নিজের পায়ে দাঁড়ানো, অর্থাৎ নিজস্ব অনুসন্ধান চালানো। সরকার এখন নতুন করে ১০০টি কূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং আধুনিক ত্রিমাত্রিক ভূ-কম্পন জরিপের মাধ্যমে সঠিক তথ্য বের করার চেষ্টা করছে। কারণ, মাটির নিচে নিজস্ব গ্যাস আবিষ্কার ছাড়া এই সংকট মেটানোর স্থায়ী কোনো বিকল্প নেই।

সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক মাস গ্যাসের এই ভোগান্তি থাকছেই। আমদানির পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদের সুষ্ঠু অনুসন্ধান ছাড়া বাংলাদেশকে গ্যাসের সংকট থেকে বের করা কঠিন।