রাস্তায় নেমে বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, বেপরোয়া রেষারেষি, আর যাত্রী নিরাপত্তার মারাত্মক অভাব—আমাদের দেশের গণপরিবহনের এই চিত্র নতুন নয়। কিন্তু এবার কি তবে বদলাতে যাচ্ছে এই চিত্র? ১ আগস্ট থেকে গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে কাজ করে এই জিপিএস প্রযুক্তি? মাত্র কয়েক হাজার টাকার একটি ডিভাইস কি পারবে কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের ভোগান্তি কমাতে? এতে কি আদৌ গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরবে? চলুন, সহজ ভাষায় পুরো বিষয়টি জেনে নেওয়া যাক।
বিআরটিএর নতুন নিয়ম
আগস্ট মাস থেকেই গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করেছে বিআরটিএ। নিয়ম অনুযায়ী, বিটিআরসির নিবন্ধিত ৪১টি প্রতিষ্ঠানের যেকোনো একটি থেকে এই ডিভাইসটি গণপরিবহনে সংযুক্ত করতে হবে। সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, গণপরিবহনে এ ডিভাইস সংযোজনের খরচ সাড়ে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আর মাসিক সার্ভিস চার্জ ৩ ৩৩ টাকা। তবে প্রথমবার পুরো এক বছরের সার্ভিস ফি একসঙ্গেই পরিশোধ করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই সিদ্ধান্তের প্রভাব কী পড়েছে? বাস্তবতা হলো, নিয়ম চালু হলেও অনেক চালক ও সহকারী এখনো বিষয়টি সম্পর্কে জানেই না। মালিকদের মধ্যেও ফিটনেস সনদ নেওয়ার আগ্রহ হঠাৎ কমে গেছে। যেমন—মিরপুর বিআরটিএ কার্যালয়ে প্রতিদিন যেখানে গড়ে ১৫টি বাস ফিটনেস পরীক্ষার জন্য আসত, সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর এক দিনে এসেছে মাত্র দুটি বাস।
জিপিএস ট্র্যাকার কীভাবে কাজ করে?
এখন প্রশ্ন হলো এই জিপিএস ডিভাইসটি আদতে কী এমন করে যে এটি নিয়ে এত আলোচনা? জিপিএস বা গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম প্রযুক্তি মূলত স্যাটেলাইটের মাধ্যমে কাজ করে। একটি জিপিএস ট্র্যাকার গাড়িতে বসানো থাকলে তা ২৪ ঘণ্টা গাড়ির অবস্থান মনিটর করে ডেটা সার্ভারে পাঠায়। চলুন দেখে নিই, এই ছোট্ট ডিভাইসের ভেতরে কী কী ক্ষমতা লুকিয়ে আছে:
১. লাইভ ট্র্যাকিং: যেকোনো স্থান থেকে মোবাইল বা কম্পিউটারে বসে গাড়িটি এই মুহূর্তে কোথায় আছে, কোনো রুটে চলছে এবং কত স্পিডে যাচ্ছে—তা লাইভ দেখা যায়।
২. ওভারস্পিড অ্যালার্ট: বর্তমানে সড়কে সবচেয়ে বড় ভয় হলো বেপরোয়া গতি। জিপিএস ট্র্যাকারে একটি নির্দিষ্ট গতিসীমা সেট করে দেওয়া যায়। ড্রাইভার সেই সীমা পার করলেই তৎক্ষণাৎ ইমেইল বা মেসেজে অ্যালার্ট চলে আসে।
৩. ইঞ্জিন লক ও আনলক: গাড়ি চুরির চিন্তা থেকে মুক্তি দিতে আছে ইঞ্জিন লক সুবিধা। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ইঞ্জিন লক করে দিলে মালিকের অনুমতি ছাড়া কেউ গাড়ি স্টার্টই দিতে পারবে না।
৪. জিওফেন্সিং: নির্দিষ্ট রুটের বাইরে গাড়ি গেলেই বা নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করলেই নোটিফিকেশন চলে আসবে।
৫. ট্রিপ ও ডিস্ট্যান্স রিপোর্ট: গাড়িটি দিনে কত কিলোমিটার চলল, কোথায় কোথায় থামল—তার পুরো ডিজিটাল হিসাব খাতা-কলম ছাড়াই নিমেষে জানা যায়।
৬. ফুয়েল রিপোর্ট ও পাওয়ার ফেইল অ্যালার্ট: জ্বালানি খরচ কেমন হচ্ছে এবং কেউ যদি দুর্ঘটনাবশত বা ইচ্ছে করে ট্র্যাকারের ব্যাটারি খুলে ফেলে—তবে সাথেই সাথেই অ্যালার্ট নোটিফিকেশন চলে যায়।
এটি কীভাবে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাবে?
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই জিপিএস প্রযুক্তি ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য যত লাভজনক, গণপরিবহনে তা কতটা কাজে দেবে? এক কথায় বললে—এটি পুরো রুট মনিটরিংকে ডিজিটালাইজ করে ফেলবে। আর এর ফলে বেপরোয়া রেষারেষি কমে আসবে। বাসের গতি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হওয়ায় ওভারস্পিডিং এবং ওভারটেকিংয়ের প্রবণতাও অনেকটাই কমে যাবে।
অনেক সময় ড্রাইভাররা জ্যাম এড়াতে বা বাড়তি ট্রিপ মারতে রুট পরিবর্তন করে। জিওফেন্সিং ও লাইভ ট্র্যাকিংয়ের কারণে কোনো বাস নির্ধারিত রুট বা বাস স্টপ পার হয়ে যেতে পারবে না। ফলে যদি কোনো গণপরিবহন নির্দিষ্ট রুট মেনে না চলে, সে তথ্য নিমেষেই পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া যাত্রীদের নিরাপত্তাও এর মাধ্যমে বাড়বে। যেমন বাসের অবস্থান জানা থাকলে যাত্রীরা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারবেন পরবর্তী বাস কত দূরে আছে। রাতে ভ্রমণের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি কমবে।
এটির আরেকটি বড় সুবিধা হলো ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং। বিআরটিএ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একটি নির্দিষ্ট সেন্ট্রাল রুম থেকে শহরের সব বাসের মুভমেন্ট একসঙ্গে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। ফলে কোনো দুর্ঘটনা বা অপরাধ ঘটলে মুহূর্তেই গাড়ির লোকেশন ট্রেস করা সম্ভব হবে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটি ড্রাইভারদের জবাবদিহিতা শতভাগ বাড়িয়ে দেবে।
পরিবহনকর্মীদের কাছে বিষয়টি হয়তো এখনো নতুন কিংবা মালিকদের কাছে সামান্য বাড়তি খরচের বিষয় মনে হতে পারে, কিন্তু একটি দীর্ঘমেয়াদী এবং সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের কোনো বিকল্প নেই। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে বহু সার্ভিস প্রোভাইডার প্রিমিয়াম ফিচারসহ লাখ লাখ যানবাহন নিরাপদে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করা গেলে বিআরটিএর এই উদ্যোগ আমাদের প্রতিদিনের যাতায়াতকে অনেক বেশি নিরাপদ ও সহজ করে তুলবে।