সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট, তবুও কেন বিদ্যুতে এ বিপর্যয়?

দেশজুড়ে এখন শুধু বিদ্যুৎ-ঘাটতি নয়, চলছে তীব্র লোডশেডিংয়ের হাহাকার। শহর থেকে শুরু করে দূর-দূরান্তের গ্রাম, গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে বড় বড় শিল্পকারখানা—সবকিছু যেন স্থবির। কিন্তু কেন হঠাৎ এই বিপর্যয়? দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যেখানে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, সেখানে মাত্র ১৫ হাজার মেগাওয়াট চাহিদাও কেন মেটানো যাচ্ছে না? চলুন সহজ ভাষায় এর পেছনের সত্যিটা জেনে নেওয়া যাক।

কত বড় এই সংকট?

পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ, তা একটি তথ্য দিলেই বুঝবেন। গত ১ আগস্ট বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল ২ হাজার ১৭৪ মেগাওয়াট, যা রোববার ভোরের দিকে এসে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াটে গিয়ে পৌঁছায়। দেশজুড়ে থাকা তালিকাভুক্ত ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬২টি বিদ্যুৎকেন্দ্রই এখন জ্বালানি সংকটে রয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি গ্যাসভিত্তিক, ৩৩টি তেলভিত্তিক এবং ২টি বিশাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর। দুর্ঘটনাটির পর পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশের বেশি কমে গেছে। দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট হলেও সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র ২১৫ কোটি ঘনফুটে। গ্যাস না থাকায় ১২ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে এখন ৪ হাজার মেগাওয়াটেরও কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।

সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিতে প্রভাব

এই দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের গ্রামবাংলা ও ক্ষুদ্র শিল্প। ময়মনসিংহের চালকল মালিকদের কথা ধরুন, দিনে ৬-৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো চালকল অলস বসে থাকছে, কর্মচারীদের বসে বসেই পারিশ্রমিক দিতে হচ্ছে। কুমিল্লার মাছচাষিরা পুকুরের পানি সেচ দিতে গিয়ে এক রাতের কাজ এখন তিন রাতেও শেষ করতে পারছেন না, বাড়তি গুনতে হচ্ছে শ্রমিকের মজুরি।

পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড বা আরইবি এলাকায় স্থানভেদে ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে। ময়মনসিংহের গ্রামগুলোতে দিনের প্রায় অর্ধেকটা সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। শিল্পাঞ্চল সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের কারখানাগুলোতে গ্যাসের প্রেসার এমনিতেই কম ছিল। তার ওপর এই বিদ্যুৎ সংকট। কারখানাগুলোকে বাধ্য হয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ডিজেল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। এতে উৎপাদনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ। আর চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়ছে দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও বাজারে পণ্যের দামের ওপর।

কেন এই বিপর্যয়?

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে—গ্যাস নেই ঠিক আছে, কিন্তু অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দিয়ে কি ঘাটতি মেটানো সম্ভব নয়? এখানেই তৈরি হয়েছে আসল প্যাঁচ। প্রথম কারণ কয়লা সংকট। ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ, আবার কয়লা সরবরাহেও রয়েছে জটিলতা। রামপাল ও এসএস পাওয়ারও পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারছে না।

দ্বিতীয় কারণ ব্যয়বহুল তেলের ব্যবহার। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি এখন বাধ্য হয়ে ফার্নেস অয়েল এবং সৈয়দপুর ও খুলনার ডিজেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাচ্ছে। এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ৫-৬ টাকা থেকে বেড়ে পৌনে ৮ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় বিতর্ক কোথায় জানেন? দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ সক্ষমতা আমাদের কাগজ-কলমে আছে! অথচ প্রাথমিক জ্বালানি অর্থাৎ গ্যাস বা কয়লার সঠিক জোগান নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে রাখা হয়েছে। আর চুক্তি অনুযায়ী—এই কেন্দ্রগুলো থেকে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হোক বা না হোক, অলস বসিয়ে রেখেও এগুলোকে দিতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্যাপাসিটি চার্জ।

গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে অলস বসে থাকার ভাড়া দেওয়া হয়েছে ৪৪ হাজার কোটি টাকা! আর চলতি অর্থবছরে তা ৪৮ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়েছে। একদিকে বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করতে না পেরে পিডিবির বকেয়া জমেছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে গ্রাহকরা পাচ্ছেন না বিদ্যুৎ।

সমাধান এবং বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?

পরিস্থিতি সামাল দিতে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এফএসআরইউ টার্মিনাল আংশিক মেরামত শেষে আগামী ১০ আগস্টের পর গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে, তবে তা স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের পর বছর দাম বাড়িয়ে এবং সাধারণ মানুষকে অন্ধকারের ভোগান্তিতে রেখে এই সংকটের সমাধান হবে না। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, জ্বালানি খাতের যে অসাধু কাঠামোর মাধ্যমে অলস কেন্দ্রের ভাড়া মেটানো হচ্ছে, এই ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কেবল অবকাঠামো তৈরি করার এই নীতি পরিবর্তন না হলে, প্রতি বছর গরম এলেই এমন লোডশেডিংয়ের মাশুল সাধারণ মানুষকে গুনেই যেতে হবে।