দুয়ার বন্ধ করছে কানাডা, ফিরতে হবে যে বাংলাদেশিদের

বিদেশি নাগরিকদের জন্য এবার শক্ত হাতে দরজা বন্ধ করতে শুরু করেছে কানাডা। আর এই কঠোর অভিবাসন নীতির ধাক্কায় এখন বড় ঝুঁকিতে পড়েছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি। কানাডা বর্ডার সার্ভিসেস এজেন্সির (সিবিএসএ) অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর তালিকার শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে উঠে এসেছে বাংলাদেশের নাম। কিন্তু হঠাৎ কেন কানাডা এত কঠোর হলো? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

কানাডা বর্ডার এজেন্সি কী বলছে?

চলুন শুরুতেই সিবিএসএর তথ্যটা স্পষ্ট করে নেওয়া যাক। ৩০ জুন পর্যন্ত পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, কানাডা থেকে অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর তালিকায় এই মুহূর্তে আছেন ৯৬৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক। অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর তালিকার শীর্ষে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে কানাডা থেকে ৩০৮ জন বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। মাঝে করোনা ও নানা কারণে এই সংখ্যা কিছুটা কম থাকলেও, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই এরই মধ্যে ২২৭ জনকে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করা হয়েছে। বর্তমানে কানাডা থেকে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় থাকা ৪০ হাজার ৮২৭ জন বিদেশি নাগরিকের মধ্যে প্রায় ৩৬ হাজার ৬২২ জনই হলেন রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী বা রিফিউজি আবেদনকারী।

অন্যান্য দেশের অবস্থা কী?

তাহলে কি শুধুই বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে? না, এই তালিকায় শুধু বাংলাদেশ একা নয়। এর শীর্ষে আছে ভারত। দেশটির ৭ হাজার ৬৬৯ জন নাগরিককে ফেরত পাঠানোর কাজ চলছে। তালিকায় ৬ হাজার ৫৬১ জন হলেন মেক্সিকোর নাগরিক। এ ছাড়া এতে আছে যুক্তরাষ্ট্রের ২ হাজার ১৭৯ জন, চীনের ১ হাজার ৮৯২ জন, নাইজেরিয়ার ১ হাজার ৬৪৭ জন এবং পাকিস্তানের ১ হাজার ১৩৯ জন নাগরিক।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—কানাডা হঠাৎ করে এত আশ্রয়প্রার্থীকে ডিপোর্ট করার এমন কঠোর সিদ্ধান্ত কেন নিল?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও জটিল সমীকরণ

কানাডায় বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন বা 'রিফিউজি ক্লেম'-এর ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে একটি বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে পরিস্থিতি অনেক বেশি পেঁচিয়ে গেছে। কানাডার বিশ্ববিদালয়ে গবেষণারত বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং ইমিগ্রেশন বিশ্লেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই জটিলতা এখন দুই ধরনের:

১. পুরোনো আবেদনকারী: যাঁরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশে নিপীড়ন ও রাজনৈতিক মামলার আশঙ্কায় কানাডায় আশ্রয় চেয়েছিলেন, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁদের আবেদনের ঝুঁকি মূল্যায়নে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

২. নতুন আবেদনকারী: যাঁরা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্টতার কারণে এখন বাংলাদেশে ফিরলে ঝুঁকিতে পড়তে পারেন—এমন দাবি তুলে নতুন করে রিফিউজি আবেদন করছেন।

সোজা কথায়, বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন অনেকে। এমনকি ভিজিটর ভিসায় ফিফা বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখতে এসে বা ভ্রমণ করতে এসেও রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করার নজির মিলছে। কানাডা ইমিগ্রেশনের তথ্যমতে, ভিজিটর ভিসায় আসা ১৭৫ জন আবেদনকারীর মধ্যে ১০ জন বাংলাদেশি। কিন্তু কানাডা সরকারও এখন বিষয়টি ধরে ফেলেছে। তারা অতীতের ঢিলেঢালা অবস্থান থেকে সরে এসে কঠোরভাবে রিফিউজি আবেদন স্ক্রিনিং বা যাচাই-বাছাই করছে। ভুয়া প্রমাণিত হলেই সরাসরি ডিপোর্টেশনের লাল চিঠি পাঠানো হচ্ছে!

ইউরোপের করুণ চিত্র

সমস্যাটা শুধু কানাডাতেই সীমাবদ্ধ নেই, ইউরোপেও একই চিত্র ফুটে উঠছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এজেন্সি ফর অ্যাসাইলামের ‘লেটেস্ট অ্যাসাইলাম ট্রেন্ডস ২০২৫’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ইউরোপে আশ্রয় আবেদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ চতুর্থ। একই বছরে ইউরোপের দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের আশ্রয় আবেদন জমা পড়েছে ৩৬ হাজার ৯০১টি। বছর শেষে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ঝুলে ছিল প্রায় ৪১ হাজারের বেশি আবেদন।

কিন্তু আসল ধাক্কাটা কোথায় জানেন? এত হাজার হাজার আবেদনের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রথম ধাপে বাংলাদেশিদের আশ্রয়ের আবেদন মঞ্জুর করেছে বা স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৯৭ শতাংশ বাংলাদেশি আশ্রয়প্রার্থীর আবেদনই বাতিল হয়ে যাচ্ছে। এমনকি মধ্য ভূমধ্যসাগরীয় রুট দিয়ে বেআইনি ও বিপজ্জনক পথে ইউরোপে প্রবেশ করার কারণেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশিদের জন্য সাধারণ ভিসা পাওয়া এখন দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছে।

সরকারের অবস্থান

কানাডা বা ইউরোপে এভাবে গণহারে ভুয়া তথ্য দিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন করার ফলে চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক স্পষ্ট জানিয়েছেন, অতীতে দেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে রাজনৈতিক মামলা বা গুমের মতো ঘটনা ঘটলেও, এখন বাংলাদেশে সেই রাজনৈতিক অস্থিরতা বা ভয়ের পরিস্থিতি নেই। তা সত্ত্বেও স্থায়ীভাবে থাকার উদ্দেশ্যে অনেকে অনিয়মিত উপায়ে ইউরোপ-কানাডায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন। অ্যাসাইলামসংক্রান্ত বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের সরাসরি সুপারিশ করার সুযোগ নেই, তবে এভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অ্যাসাইলাম আবেদনের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করছে।

বাস্তবতা হলো—এই ধরনের ভুয়া আবেদনের কারণে যাঁরা সত্যি সত্যি উচ্চশিক্ষা, লিগ্যাল ওয়ার্ক পারমিট কিংবা বৈধ ভিসা নিয়ে কানাডা বা ইউরোপে যেতে চান, তাঁদের ভিসার ফাইল রিজেকশন রেট বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। কানাডা হোক বা ইউরোপ—শর্টকাট পথে কিংবা রিফিউজি সেজে বিদেশে স্থায়ী হওয়ার দিন এখন শেষ বললেই চলে। উন্নত দেশগুলোর কড়া নজরদারি ও ডাটা শেয়ারিংয়ের যুগে মিথ্যা আশ্রয়ের আবেদন করে পার পাওয়া এখন অসম্ভব বললেই চলে। কানাডা থেকে এই ৯৬৮ জনকে ফেরত পাঠানোর বার্তাটি খুবই স্পষ্ট: নিয়ম মেনে, বৈধ উপায়ে না এলে স্বপ্নের দেশ একদিন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে সময় লাগবে না!