ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক পেট্রোলিং পয়েন্টে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না চীন। এমনকি রাজ্যটির নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে চীনা বাহিনীর অবৈধ দখলের খবরও সামনে এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি আঞ্চলিক দলের তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন ঘিরে নয়াদিল্লির রাজনীতিতে বইছে তুমুল বিতর্ক।
তথ্যটি সামনে এসেছে অরুণাচল প্রদেশের অত্যন্ত দুর্গম ও পাহাড়ি জেলা আপার সুবানসিরি থেকে। এমন এক সময়ে এই তথ্য সামনে এল যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধের কারণে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুই দেশের সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিতের চেষ্টা করছেন। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লি সফরের কথা আছে। এর ঠিক আগে এই খবর দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তথ্যানুসন্ধানী দলের বিস্ফোরক তথ্য
অনুপ্রবেশের প্রাথমিক খবর পাওয়ার পর পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (পিপিএ) আপার সুবানসিরিতে চার সদস্যের একটি তদন্ত দল পাঠায়। দলটির নেতা কলিং জেরাং আল জাজিরাকে জানান, প্রতিকূল আবহাওয়া, পাহাড়ি ঢল ও ধসের কারণে প্রতিবছর এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত তকসিং এলাকায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিয়মিত টহল থাকে না। তবে এই পুরো সময়জুড়ে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) ওই এলাকায় সক্রিয় থাকে।
জেরাংয়ের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালে চীনা বাহিনীর সঙ্গে এক সংঘাতের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর দল সেখান থেকে সরে আসে। স্থানীয় বাসিন্দারাও শিকারের জমি হারিয়ে চরম ক্ষুব্ধ। অবশ্য এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ধীরে ধীরে সীমানা প্রসারিত করছে চীন।
ভারত ও চীনের প্রতিক্রিয়া
ভারতীয় সেনাবাহিনী এই প্রতিবেদনকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুর কিছুটা ভিন্ন। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ভারতের অগ্রাধিকার এবং সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরই দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ক নির্ভর করে।
অন্যদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানান, সীমান্ত পরিস্থিতি বর্তমানে স্থিতিশীল আছে। উভয় দেশই কূটনৈতিক ও সামরিক আলোচনার মাধ্যমে শান্তি বজায় রাখতে সম্মত হয়েছে।
সীমান্ত বিরোধ ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য
ভারত ও চিনের মধ্যে ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটারের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যা লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল (এলএসি) নামে পরিচিত। তবে দুই দেশের কেউই এই সীমানাকে একইভাবে চিহ্নিত করে না। ১৯১৪ সালের শিমলা চুক্তি অনুযায়ী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত ও তিব্বতের মধ্যবর্তী ম্যাকমহোন লাইনকে ভারত সীমান্ত হিসেবে মানলেও চীন তা স্বীকার করে না। তারা অরুণাচল প্রদেশকে দক্ষিণ তিব্বত বা জাংনান হিসেবে দাবি করে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করে। তবে সীমান্ত বিরোধ সত্ত্বে দুই দেশের বাণিজ্য বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় পণ্য বাণিজ্য পৌঁছেছে ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে, যার বড় অংশই ভারতে চীনা পণ্যের আমদানি।
বিশ্লেষকদের মতে, সীমান্ত বিরোধকে চীন ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। অর্থনীতি ও কূটনৈতিক সম্পর্কের সাময়িক অগ্রগতি হলেও মূল সীমান্ত বিরোধ না মেটা পর্যন্ত দুই শক্তির মধ্যে এই ছায়াযুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।