সরকারি দপ্তরে কোনো কাজের জন্য গেছেন, আর ঘুষের দাবি শোনেননি—এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। কোন দপ্তরে ঘুষের রাজত্ব বেশি? এগুলোর হিসাবই বা রাখছে কে? চুপ থাকার দিন কিন্তু শেষ। কারণ বাজারে এসেছে এমন এক ডিজিটাল ডায়েরি—যেখানে নাম-পরিচয় গোপন রেখে আপনি ফাঁস করে দিতে পারেন ঘুষের আসল চিত্র। ওয়েবসাইটের নাম—ঘুষ.সাইট। কিন্তু কারা বানালো এটি? আর এখানে অভিযোগই বা করা যাবে কীভাবে? চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ঘুষ.সাইট নিয়ে এত শোরগোল কেন?
চালুর মাত্র তিন দিনেই ঘুষ.সাইটে অভিযোগ জমা পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০০টি। আর চাওয়া ঘুষের মোট হিসাব শুনলে মাথা ঘুরে যাবে—২৫ কোটি টাকারও বেশি। মূলত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায়, কোন দপ্তরে এবং কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে—তা প্রকাশ্যে আনতেই চালু হয়েছে নতুন এই প্ল্যাটফর্ম। এটি তৈরি করেছেন দুই তরুণ উদ্যোক্তা ও দুই বন্ধু—সাইফ কবির এবং শাহেদ শরীফ। বিদেশে এমন একটা কনসেপ্ট দেখে তাঁরাও চিন্তা করলেন, দেশের ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলোকে এক ছাদের নিচে আনতে।
মাত্র তিন দিনেই এতে ঝড়ের গতিতে অভিযোগ আসছে। পরিসংখ্যানটা দেখলে মাথা ঘুরবেই। তিন দিনে ঘুষ.সাইটে অভিযোগ এসেছে মোট ১ হাজার ৮৯৪টি। আর মোট দাবিকৃত ঘুষের পরিমাণ ২৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ অভিযোগ এসেছে ঢাকা বিভাগ থেকে, ৮৮৭টি। এর পরেই আছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ। তবে সবচেয়ে ইতিবাচক খবর হলো—অভিযোগকারীদের মধ্যে অন্তত ১৮ শতাংশ মানুষ সাহস করে জানিয়েছেন, তাঁরা ঘুষ দিতে অস্বীকার করেছেন।
এটা কি কোনো তদন্ত সংস্থা?
অনেকেই ভাবছেন, এখানে অভিযোগ করলেই হয়তো পুলিশ বা দুদক গিয়ে অপরাধীকে ধরে নিয়ে আসবে। কিন্তু না, উদ্যোক্তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এটি কোনো আইনি প্রমাণ বা দুদকের বিকল্প নয়। সাইটে প্রকাশিত প্রতিটি রিপোর্টের গায়ে স্পষ্ট করে লেখা থাকে ‘আনভেরিফায়েড’ বা যাচাই করা হয়নি। তাহলে এর লাভ কী? লাভ হলো—এটি একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল রেকর্ড। আপনি সেবা নিতে যাওয়ার আগেই দেখে যেতে পারবেন—সেই দপ্তরে আপনার মতো অন্য নাগরিকদের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল। আপনি আগে থেকেই সতর্ক হতে পারবেন।
পরিচয় ফাঁস হয়ে যাবে না তো?
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এখানে অভিযোগ করলে কি নাম-পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাবে? অভিযোগকারীর কোনো ক্ষতি হবে না তো? একদম না! এখানে অভিযোগ পাঠাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খুলতে হয় না, ই-মেইল বা ফোন নম্বরও দিতে হয় না। আরও একটা মজার বিষয় শুনুন—আপনি চাইলেও নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর দিয়ে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করতে পারবেন না।
আপনি অভিযোগ পাঠানোর পর তা সরাসরি সাইটে যায় না। ব্যাকএন্ডে কঠোর মডারেশন টিম বসে আছে। তারা আপনার দেওয়া তথ্য থেকে ব্যক্তিগত আক্রমণ, নাম বা ফোন নম্বর মুছে ফেলে, তারপর কেবল সিস্টেমিক অনিয়মের অংশটুকু লাইভ করে। উদ্দেশ্য কিন্তু কোনো মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা নয়, বরং পুরো খাতের আসল চেহারাটা তুলে ধরা।
অভিযোগ করবেন কীভাবে?
আসুন এবার দেখে নিই, মাত্র ২ মিনিটে কীভাবে আপনি ঘুষ.সাইটে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন।
ধাপ ১: ব্রাউজার খুলে চলে যান ghush.site লিংকে।
ধাপ ২: কোনো সাইন-আপ বা লগইন ছাড়া সরাসরি ‘অভিযোগ জানান’ অপশনে ক্লিক করুন।
ধাপ ৩: মাত্র ৫টি মূল তথ্য দিন:
১. দপ্তরের নাম (যেমন: পাসপোর্ট অফিস, বিআরটিএ, ভূমি অফিস ইত্যাদি)
২. সেবার ধরন (ড্রাইভিং লাইসেন্স, নামজারি ইত্যাদি)
৩. আপনার এলাকা বা অঞ্চল
৪. কত টাকা ঘুষ চাওয়া হয়েছিল?
৫. শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছিল? (অর্থাৎ আপনি টাকা দিয়েছেন, নাকি অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন?)
ধাপ ৪: চাইলে সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিতে পারেন—তবে মনে রাখবেন, কোনো ব্যক্তির নাম-পদবি লেখা যাবে না।
ব্যস! সাবমিট করে দিন। মডারেশন শেষে আপনার অভিজ্ঞতাটি যোগ হয়ে যাবে এই উন্মুক্ত ডিজিটাল ডায়েরিতে।
কার স্বার্থে এই উদ্যোগ?
এখন কথা হচ্ছে, এই সাইট চালিয়ে সাইফ আর শাহেদের লাভ কী? কোনো এনজিও বা বিদেশি ফান্ড আছে নাকি? একদমই না! কোনো এনজিও বা প্রাতিষ্ঠানিক অনুদান ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজেদের টাকা খরচ করেই এই দুই তরুণ প্ল্যাটফর্মটি চালাচ্ছেন। তবে সাধারণ মানুষ চাইলে স্বেচ্ছায় অনুদান দিতে পারেন।
উদ্যোক্তা সাইফ কবিরের ভাষায়—“আমাদের সাফল্যের মাপকাঠি ভিজিটর সংখ্যা নয়। কোনো নাগরিক সেবা নিতে যাওয়ার আগে যদি মানুষের অভিজ্ঞতা দেখে সচেতন হতে পারেন এবং অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করতে পারেন, সেটাই আমাদের আসল সাফল্য।”
আপনার–আমার সচেতনতাই পারে দুর্নীতি কমাতে। আপনি কি কখনো সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষের মুখোমুখি হয়েছেন? ঘুষ দিয়েছিলেন নাকি সাহসিকতার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন?