বিশ্বের অর্ধেক তেল সরবরাহ যুদ্ধের কবলে, কোন পথে হাঁটছে অর্থনীতি?

কল্পনা করুন—পৃথিবীর প্রতি দুই ব্যারেল তেলের একটি আসছে এমন এক দেশ থেকে, যেখানে হয় যুদ্ধ চলছে, নয়তো আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ। এটাই আজকের বাস্তবতা। টানা যুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা আর নৌপথে নিরাপত্তার অভাব—সব মিলিয়ে বিশ্বের জ্বালানি বাজার দাঁড়িয়ে আছে এক নজিরবিহীন ও নাজুক বাঁকে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তৈরি একটি হিসাব বলছে, ইরান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, লিবিয়া সংকট আর ভেনেজুয়েলার ওপর মার্কিন বিধিনিষেধ—এই চার কারণে প্রভাবিত দেশগুলো ২০২৫ সালে দৈনিক উৎপাদন করেছে প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল, যা বিশ্বের মোট সরবরাহের ৪৩ শতাংশেরও বেশি। এর মানে এই নয় যে এই পুরো পরিমাণ তেলই বাজার থেকে হারিয়ে গেছে—বছরজুড়ে এসব দেশের উৎপাদন ও পরিশোধন সক্ষমতা কমবেশি ব্যাহত হয়েছে মাত্র। কিন্তু সরবরাহের এত বড় অংশ যখন অস্থির অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত, তখন গোটা বাজারই হয়ে ওঠে চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

ইরান সংকট ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে ইরান ঘিরে তৈরি হওয়া যুদ্ধ থেকে। ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হওয়ার ছয় মাস পরও এর কোনো স্পষ্ট সমাপ্তি দেখা যাচ্ছে না। এই যুদ্ধ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে তেল উৎপাদন, পরিশোধন আর পরিবহন—সব কিছুকেই ব্যাহত করেছে।

সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম হরমুজ প্রণালি—উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রফতানির এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয় বিশ্বের উৎপাদিত জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর তৈরি হওয়া উত্তেজনায় এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল এতটাই বাধাগ্রস্ত হয়েছে যে বিশ্লেষকদের হিসাবে, উপসাগরীয় তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ ব্যারেল কমে গেছে।

সৌদি আরব কিছু তেলের রুট ঘুরিয়ে দিয়েছে লোহিত সাগরের পথে, উপসাগরীয় রফতানিকারকরাও খুঁজছে বিকল্প পথ। কিন্তু এসব বিকল্প রুট ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারছে না—সাম্প্রতিক মাসগুলোয় লোহিত সাগর ও মিসরের সুয়েজ খালের কাছে হামলার ঘটনা প্রমাণ করেছে, মূল সংঘাত অঞ্চলের বাইরেও বিপদ কত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে তেল আমদানিকারক দেশগুলোকে এখন লড়তে হচ্ছে দ্বিমুখী সমস্যার সঙ্গে—তেল পাওয়া যাচ্ছে কি না, আর পাওয়া গেলেও তা পরিবহন করা যাচ্ছে কি না।

রাশিয়ার শোধনাগারে আঘাত, বাড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট
রাশিয়ার তেল শিল্প ভুগছে ভিন্ন এক চাপে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ ধরে ইউক্রেন রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা জোরদার করেছে, লক্ষ্যবস্তু করছে শোধনাগার ও অন্যান্য স্থাপনা—কিছু হামলা তো ইউক্রেন-নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ড থেকে হাজার কিলোমিটার দূরেও চালানো হয়েছে। এতে রাশিয়ার তেল পরিশোধন ক্ষমতা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। অভ্যন্তরীণ ঘাটতি সামলাতে মস্কো পেট্রোল ও ডিজেল রফতানিতে নানা বিধিনিষেধ জারি করেছে—ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হয়েছে।

রাশিয়ার মস্কোর একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলা। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

এই প্রভাব শুধু রাশিয়াতেই আটকে নেই। অঞ্চলের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদক কাজাখস্তানও এ বছর উৎপাদন ও পরিশোধনে বিঘ্নের মুখে পড়েছে। উপসাগরীয় সংকট আর ইউক্রেন যুদ্ধ—দুইয়ে মিলে রয়টার্সের হিসাবে বিশ্বের তেল পরিশোধন ক্ষমতা কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ফলে বাজারে অপরিশোধিত তেল সহজলভ্য থাকলেও, তা থেকে পেট্রোল বা ডিজেল তৈরির শোধনাগার-ঘাটতি দাম বাড়িয়ে দিতে পারে ঠিক একই মাত্রায়।

লিবিয়া, ভেনেজুয়েলা ও নতুন মাত্রার ঝুঁকি
সংকট শুধু ইরান-রাশিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। লিবিয়ার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশটির তেল উৎপাদন ও রফতানিকে বারবার ব্যাহত করছে। ভেনেজুয়েলাও পড়েছে মার্কিন অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের মুখে, যা সংকুচিত করেছে সরবরাহের আরেকটি উৎস।

এই সব বিঘ্ন সবসময় একসঙ্গে ঘটেনি—অন্য উৎপাদকদের সরবরাহে ভর করে বাজার এখনো পুরোপুরি ধসে পড়া থেকে বেঁচে গেছে। কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো ঝুঁকি সক্রিয় থাকায় পুরো ব্যবস্থাই হয়ে উঠেছে অনেক বেশি নাজুক। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখানেই—আগের ধাক্কা থেকে বাজার পুরোপুরি সামলে ওঠার আগেই হয়তো আঘাত হানতে পারে আরেকটি বড় বিপর্যয়।

এমনকি এই সংঘাতগুলোর বাইরের দুনিয়াও রেহাই পায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চলতি বছরের শুরুতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহে যুক্তরাষ্ট্রেও সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোও চরম আবহাওয়া বা অবকাঠামোগত বিপর্যয়ের ঝুঁকিতে থাকে। এসব বিঘ্নের মধ্যেই বিশ্ব বাজারে বেড়েছে মার্কিন তেলের গুরুত্ব—আমেরিকান উৎপাদকরা অন্য জায়গার ঘাটতি পূরণে এগিয়ে এসে ভোক্তা ও শোধনাগারগুলোকে দিয়েছে বিকল্প উৎস। তবে এই ঘটনা এটাও স্পষ্ট করে দেয় যে, উৎসে বৈচিত্র্য আনার মানে ঝুঁকি একেবারে মুছে ফেলা নয়—বরং সেটাকে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে দেওয়া মাত্র।

তেল শোধনই হয়ে উঠছে আসল সমস্যা
সংকটের একটি কম আলোচিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরিশোধন ক্ষমতার ক্ষতি। বেশিরভাগ ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের আগে অপরিশোধিত তেলকে রূপান্তর করতে হয় পেট্রোল, ডিজেল বা জেট ফুয়েলে। ইরান আর ইউক্রেন যুদ্ধ মিলিতভাবে অকেজো করে দিয়েছে বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য পরিশোধন সক্ষমতা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যকার সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরামকোর তেল শোধনাগারে ইরানের হামলা। ছবি: রয়টার্স

রাশিয়ার জ্বালানি ঘাটতিই এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ—শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলায় দেশটির অভ্যন্তরীণ জ্বালানি প্রাপ্যতা কমেছে, মস্কো বাধ্য হয়েছে রফতানি সীমিত করতে, যার প্রভাব পড়েছে রাশিয়ার বাইরের বাজারেও। এমনকি শোধনাগারগুলো উচ্চ ক্ষমতায় চলার পরও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম পৌঁছে গেছে রেকর্ড উচ্চতায়—যা প্রমাণ করে, সংকটের ঢেউ শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই নয়, পৌঁছে গেছে পেট্রোল পাম্প আর পণ্য পরিবহন বাজার পর্যন্তও।

মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনীতিতে ক্ষতিকর ছোবল
জ্বালানির চড়া দাম এখন প্রভাব ফেলছে গোটা অর্থনীতিতে। ডিজেল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি চালায় ট্রাক, জাহাজ, নির্মাণ যন্ত্র আর কৃষি সরঞ্জাম—এর দাম বাড়লে বেড়ে যায় পণ্য পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ, যা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তার ঘাড়ে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এটি এক কঠিন ধাঁধা—জ্বালানির দাম মুদ্রাস্ফীতিকে আরও উসকে দিলে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচুতে ধরে রাখতে হতে পারে। তেলের চড়া দাম আর সুদের হারের এই দ্বিমুখী চাপ ইতিমধ্যেই ভারী ঋণের বোঝায় জর্জরিত দেশগুলোর ওপর তৈরি করছে বাড়তি চাপ। বিশেষভাবে ঝুঁকিতে ভারত ও বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিকারক দেশ—যাদের রফতানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সার্বিক অর্থনীতি এই দ্বিমুখী ধাক্কায় পড়ছে মারাত্মক চাপে।

জরুরি রিজার্ভ দিচ্ছে শুধু সাময়িক স্বস্তি
সরবরাহের এই ধাক্কা সামলাতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তাদের কৌশলগত জরুরি মজুদ থেকে বাজারে ছেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ তেল—যা এতদিন কাজ করেছে এক গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা প্রাচীর হিসেবে। কিন্তু এই জরুরি ব্যবস্থার বেশিরভাগই এখন প্রায় শেষের পথে, আর বৈশ্বিক মজুদও কমছে ক্রমাগত। বিশেষজ্ঞদের মতে, কৌশলগত মজুদ দিয়ে সাময়িক ঘাটতি মেটানো গেলেও বিশ্বজুড়ে যে উৎপাদন ও পরিশোধন ক্ষমতা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা দ্রুত পুষিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে নতুন কোনো বড় বিঘ্ন এলে তা সামাল দেওয়ার নিরাপত্তা বলয় আগের চেয়ে অনেক সংকুচিত—আর তাই আগামী কয়েক মাস বিশ্ব তেল বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই সংকট কেন আলাদা
তেলের বাজার আগেও বড় বড় ধাক্কার মধ্য দিয়ে গেছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকট, উপসাগরীয় যুদ্ধ এবং অন্যান্য সংঘাত বৈশ্বিক সরবরাহ ও দামে সৃষ্টি করেছিল মারাত্মক অস্থিরতা। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিকে আলাদা করে তুলেছে ঝুঁকির ব্যাপকতা।

ইরানে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ছবি: রয়টার্স

ইরান হুমকি দিচ্ছে উপসাগর থেকে সরবরাহ বন্ধ করার। ইউক্রেন লক্ষ্যবস্তু করছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো। লিবিয়া রাজনৈতিকভাবে এখনও অস্থির। ভেনেজুয়েলার রফতানি আটকে আছে বিধিনিষেধে। হরমুজ প্রণালি আর লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ রয়ে গেছে অরক্ষিত। আর একই সময়ে চরম আবহাওয়া উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে এমন দেশগুলোতেও, যারা এসব সংঘাতে সরাসরি জড়িতই নয়।

ফলে বিশ্বের তেল উৎপাদনের একটি বড় অংশ এখন কোনো না কোনো ভূ-রাজনৈতিক বা প্রাকৃতিক ঝুঁকির মুখে। তেল আমদানিকারক অর্থনীতির জন্য এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী—দীর্ঘ সময় ধরে চড়া তেল ও জ্বালানির দাম মানে বাড়তি আমদানি খরচ, বড় বাণিজ্য ঘাটতি, দেশীয় মুদ্রার ওপর চাপ আর বাড়তি মুদ্রাস্ফীতি। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলো এই ওঠানামায় বিশেষভাবে স্পর্শকাতর, কারণ আন্তর্জাতিক তেলের দামের যেকোনো পরিবর্তন দ্রুতই প্রভাব ফেলে পরিবহন ও উৎপাদনের সামগ্রিক খরচে।

তাই আসল প্রশ্নটা আর শুধু এই নয় যে বিশ্ব কত ব্যারেল তেল হারাচ্ছে। আসল প্রশ্ন হলো—পরের বড় ধাক্কাটা যখন আসবে, তখন তা সামলানোর মতো বাড়তি উৎপাদন সক্ষমতা বিশ্ববাজারে আদৌ কতটা অবশিষ্ট থাকবে। বিশ্বের ৪৩ শতাংশেরও বেশি তেল সরবরাহকারী দেশ এখন সংঘাত বা বড় বিধিনিষেধের কবলে থাকায়, আরেকটি ধাক্কা সামলানোর জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। ঠিক এই কারণেই, আগামী দিনগুলোয় তেলের দাম আর বৈশ্বিক অর্থনীতি কোন দিকে মোড় নেয়—সেদিকেই এখন সতর্ক নজর বিশেষজ্ঞদের।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স, ফাস্টপোস্ট, নিউজ২৪