রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে সারা দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় আসতে যাচ্ছে এক বিরাট পরিবর্তন! একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। একদিকে অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আর অন্যদিকে, রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধে তৈরি হচ্ছে নতুন নীতিমালা। এখন প্রশ্ন হলো, ঢাকার কোন কোন রাস্তায় আর রিকশা চলবে না? আর রাতের দূরপাল্লার জনপ্রিয় স্লিপার বাসগুলোই বা কেন হঠাৎ সরকারের নজরে এলো? চলুন আলোচনায় যাওয়া যাক।
প্রধানমন্ত্রী ঠিক কী নির্দেশ দিয়েছেন?
শুরুতেই আসি বাসের বিষয়ে। ইদানীং দূরপাল্লার রুটে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ডাবল ডেকার স্লিপার বাস। আরামে শুয়ে-বসে গন্তব্যে যাওয়া যায় বলে যাত্রীদের কাছে এগুলোর চাহিদাও প্রচুর। কিন্তু সমস্যাটা কোথায়? সমস্যা হলো, এদের অনেকেরই কোনো বৈধ অনুমোদন বা বডির সঠিক ফিটনেস অনুমোদন নেই। একটি সাধারণ বাসকে কেটে-ছেঁটে দুই তলা বা স্লিপার বানিয়ে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা হাইওয়েতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর ঠিক এই কারণেই প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন, যেসব ডাবল ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যাত্রীর আরামের চেয়ে যাত্রীর সুরক্ষা বা নিরাপত্তার বিষয়টি অগ্রগণ্য।
প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ হচ্ছে?
এবার আসি রাজধানীর সবচেয়ে আলোচিত, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়ে। রোববার সংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন—খসড়া বিধিমালা বা নীতিমালা চূড়ান্তের পর ঢাকার কোনো প্রধান সড়কেই আর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলতে দেওয়া হবে না।
আমরা সবাই জানি, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে মূল সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশার দাপট মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। এসব রিকশার গতি বেশি, কিন্তু ব্রেক বা ফিটনেস ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ফলে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে এবং তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এমনকি মানুষের প্রাণহানির ঘটনাও সামনে এসেছে। সরকার এখন এই পুরো বিষয়টিকে একটি আইনি ও সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে চাইছে।
কোন রিকশা বৈধ, কোনটা অবৈধ?
অনেকেই ভাবছেন, তাহলে কি ঢাকা থেকে সব ই-রিকশা বা অটোরিকশা তুলে দেওয়া হবে? উত্তর হলো—না, একবারে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। তবে আসছে কড়া নিবন্ধন ব্যবস্থা। মীর শাহে আলম জানান, ঢাকায় চলাচলের জন্য শুধু ২ সিট এবং ৪ সিটের ই-রিকশাগুলোকেই নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে। এখন সড়কে বড় আকারের ৬ সিটের যে ই-রিকশা বা অটোরিকশা দেখা যায়, সেগুলো কোনোভাবেই আর নিবন্ধন পাবে না। অর্থাৎ, ৬ সিটের রিকশাগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ বলে গণ্য হবে এবং সেগুলোকে রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। সহজ কথায়, ২ ও ৪ সিটের ই–রিকশা শর্তসাপেক্ষে নিবন্ধনের সুযোগ থাকছে, আর ৬ সিটেরগুলো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এলাকাভিত্তিক রঙ
নতুন এই নীতিমালায় আরও দুটি দারুণ এবং চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথমত এলাকাভিত্তিক আলাদা রঙ। প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, একেক এলাকায় আলাদা আলাদা রঙের রিকশা থাকবে। এর অর্থ হলো, নির্দিষ্ট এলাকার রিকশা কেবলমাত্র সেই এলাকাতেই চলাচল করবে। এই যেমন, মিরপুরের রিকশা মিরপুরেই থাকবে, ধানমন্ডির রিকশা ধানমন্ডিতে। আর এটি সহজেই বোঝা যাবে রিকশার রঙ দেখে। মূলত অন্য এলাকার রিকশা এসে যেন শহরে অতিরিক্ত জ্যাম তৈরি না করে সেজন্যেই এই ব্যবস্থা।
দ্বিতীয়ত, সৌর বিদ্যুতে চার্জ দেওয়া। ব্যাটারি রিকশার অন্যতম বড় সমালোচনা হলো, এগুলো জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ চুরি করে চার্জ দেওয়া হয়। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখন থেকে এসব রিকশা চার্জ দিতে হবে সৌর বিদ্যুৎ বা সোলার পাওয়ারের মাধ্যমে। এতে জাতীয় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
তাহলে পুরো বিষয়টির সারসংক্ষেপ দাঁড়াচ্ছে, অনুমোদনহীন ডাবল ডেকার স্লিপার বাস উচ্ছেদ করা হবে এবং রাজধানীর প্রধান সড়কে ব্যাটারি রিকশা পুরোপুরি নিষিদ্ধ হচ্ছে। শুধুমাত্র ২ ও ৪ সিটের বৈধ ই-রিকশা নিবন্ধন পাবে, তবে ৬ সিটেরগুলো নয়। পাশাপাশি এই ই-রিকশা চলবে নির্দিষ্ট এলাকায় রঙ মেনে এবং এগুলোর ব্যাটারি চার্জ দিতে হবে সৌর বিদ্যুতে। সরকারের এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে ঢাকার যানজট ও হাইওয়ের দুর্ঘটনা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যাচ্ছে।