সন্তান হারিয়ে গেলে প্রথম ১ ঘণ্টায় কী করবেন?

একটি শিশু হারিয়ে গেলে পরিবারের ওপর দিয়ে ঝড় বয়ে যায়। অনেকেই বুঝতে পারেন না কী করা উচিত, কোথায় যাওয়া উচিত। আর ঠিক এই আতঙ্কের মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যায় সবচেয়ে মূল্যবান সময়। পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই শিশু নিখোঁজের ঘটনায় প্রায় ১৬ হাজার জিডি হয়েছে। এই সংখ্যা শুধু কোনো পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি জিডির পেছনে রয়েছে এক একটি আতঙ্কিত পরিবার। প্রশ্ন হলো, শিশুর খোঁজ না মিললে আগে কী করা উচিত? চলুন জেনে নেওয়া যাক।

গোল্ডেন আওয়ার কেন জরুরি?

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ১ থেকে ৩ ঘণ্টা সময়কে বলা হয় ‘গোল্ডেন আওয়ার’। কারণ এই সময়ে—শিশুটি আশপাশের এলাকাতেই থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। কোনো অপহরণকারী বা চক্র তাকে দূরে বা অন্য জেলায় নিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায় না এবং সিসিটিভি ফুটেজ বা প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যও থাকে তাজা। অতএব, সন্তানকে খুঁজে না পেলে এমনিতেই ফিরে আসবে ভেবে অপেক্ষা করে এই গোল্ডেন আওয়ার নষ্ট করা যাবে না।

প্রথম ঘণ্টায় করণীয়

যদি শিশু হারিয়ে যায়, তবে আতঙ্কিত না হয়ে ধাপে ধাপে এই জরুরি পদক্ষেপগুলো নিন:

১. দ্রুত নিখোঁজ স্থানের চারপাশ অনুসন্ধান: বাড়ির আশপাশের খেলার মাঠ, কাছের দোকান, সিসিটিভি ক্যামেরা আছে এমন দোকান বা মোড়গুলোতে আগে খোঁজ নিন। মেলা বা ভিড়ের জায়গা হলে মাইক বা লাউডস্পিকারে সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণা দিন।

২. জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯: এক মুহূর্ত দেরি না করে ৯৯৯-এ কল দিয়ে শিশুর বিস্তারিত তথ্য যেমন—বয়স, গায়ের রং, পরনের পোশাক জানান। এ ছাড়া বিশেষ চাইল্ড ট্র্যাকিং হেল্পলাইন ১৬২১৯ বা মুন অ্যালার্টে ফোন করে তথ্য রেজিস্টার করুন।

৩. নিকটস্থ থানায় তাৎক্ষণিক জিডি: ২৪ ঘণ্টা না হলে জিডি নেওয়া হয় না—এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। শিশু নিখোঁজের ক্ষেত্রে পুলিশ তাৎক্ষণিক জিডি বা অভিযোগ গ্রহণ করে। জিডি করার সময় শিশুর সাম্প্রতিক পরিষ্কার ছবি এবং পরনের পোশাকের স্পষ্ট তথ্য দিন।

৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার: ফেসবুক বা লোকাল অনলাইন গ্রুপগুলোতে শিশুর ছবি, হারিয়ে যাওয়ার স্থান, যোগাযোগের নম্বর এবং জিডি নম্বরসহ পোস্ট দিন। সম্প্রতি পাঁচ ও আট বছরের দুটি শিশুকে এভাবেই দ্রুত তথ্য ছড়িয়ে দিয়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।

নিখোঁজের পর দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুফল কিন্তু প্রমাণিত। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট করেছেন, সাত মাসে ১৫ হাজার ৭১৭টি শিশু নিখোঁজের জিডি হলেও, এর একটি বড় অংশ কিন্তু দ্রুতই পরিবারের কাছে ফিরে এসেছে বা উদ্ধার করা গেছে। অর্থাৎ, নিখোঁজ হওয়া মাত্রই জিডি এবং দ্রুত তথ্য ছড়ানোর ফলেই কিন্তু এদের বিশাল অংশকে ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়েছে।

তবে অনেক শিশুই দীর্ঘদিন পরও ফেরেনি। তাদের ক্ষেত্রে সমন্বিত তথ্য প্রচার এবং প্রযুক্তিনির্ভর চাইল্ড ট্র্যাকিং ব্যবস্থার ঘাটতি ছিল। তাই থানায় শুধু জিডি করে বসে না থেকে পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার সাথে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখাও জরুরি।

কীভাবে শিশুকে সুরক্ষিত রাখবেন

দুর্ঘটনার আগেই কিছু সতর্কতা আপনার শিশুকে নিরাপদ রাখতে পারে।

    যোগাযোগের তথ্য সাথে রাখা: শিশুর পকেটে, ব্যাগে বা আইডি কার্ডে অভিভাবকের সচল ফোন নম্বর লিখে রাখুন।

    শিশুকে শেখানো: একটু বড় শিশুদের নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম এবং জরুরি ফোন নম্বর মুখস্থ করান।

    বিপদের বন্ধু চেনানো: ভিড়ে হারিয়ে গেলে পুলিশ সদস্য, সিকিউরিটি গার্ড বা কোনো দোকানের ক্যাশিয়ারের সাহায্য নেওয়ার শিক্ষা শিশুকে আগে থেকেই দিন।

একটি শিশুর সুরক্ষা শুধু তার পরিবারের একার দায়িত্ব নয়, পুরো সমাজের। আপনার চারপাশে কোনো শিশুকে একা বা অসহায় ঘুরতে দেখলে অবহেলা না করে এগিয়ে আসুন, ৯৯৯-এ জানান। মনে রাখবেন, শিশু হারিয়ে গেলে মূল চাবিকাঠি হলো—সচেতনতা, দ্রুত জিডি এবং গোল্ডেন আওয়ারের সঠিক ব্যবহার।