এনআইডি-বিকাশ অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টও বিক্রি হচ্ছে কালোবাজারে?

আপনার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, কাল রাতে কার সাথে কত মিনিট কথা বলেছেন, এই মুহূর্তে আপনি কোথায় আছেন—এমনকি আপনার বিকাশ অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্ট পর্যন্ত। ভেবেছেন এগুলো আপনার ব্যক্তিগত গোপন তথ্য? ভুল ভাবছেন। মাত্র ৫০০ থেকে ১০০০ টাকার বিনিময়ে আপনার এই অতি সংবেদনশীল ডাটা এখন অনলাইনের খোলা হাটে বিক্রি হচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের এক ভয়াবহ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এ তথ্য। চলুন একদম সহজ ভাষায় বোঝার চেষ্টা করি এর ভয়াবহ পরিণতি।

১৭ মিনিটে বের হলো এনআইডি

ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা নিজেদের কতটা নিরাপদ মনে করি? ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান যা উন্মোচন করেছে, তা যে কারও গায়ে কাঁটা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। ভোটার তালিকার খোঁজে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে ফেসবুকের মন্তব্যের ঘরে পাওয়া যায় এক অদ্ভুত শব্দ—সাইন কপি। এই একটি শব্দ দিয়ে খোঁজাখুঁজি করতেই পাওয়া গেল প্রায় ৬৭৫টি পোস্ট, যার ৬০৫টিতেই ছিল সরাসরি ব্যক্তিগত তথ্য বিক্রির অফার।

গবেষকেরা গ্রাহক সেজে টেলিগ্রামে এক বিক্রেতাকে মাত্র ৫০০ টাকা আর একটা মোবাইল নম্বর দেন। ফল? মাত্র ১৭ মিনিটের মাথায় হাতে চলে আসে সেই সিম মালিকের শতভাগ নিখুঁত এনআইডি কার্ডের আসল কপি। এমনকি দুই মাস আগে সংশোধন করা মায়ের নামটিও একদম আপডেট অবস্থায় পাওয়া গেছে। আপনি কোথায় আছেন, কার সাথে কথা বলছেন—সব তথ্যই হাতবদল হয়ে অন্যের কাছে চলে যাচ্ছে। ঘটনা শুধু এনআইডি বা জন্মনিবন্ধনেই থেমে নেই। হেল্প বিডি নামের একটি টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টের বিক্রেতারা প্রকাশ্যেই বিক্রি করছে, ৩ মাসের কল ডিটেলস রেকর্ড, মোবাইল ফোনের রিয়েল-টাইম লোকেশন, এসএমএস তালিকা ও আইএমইআই নম্বর, টিআইএন, পাসপোর্ট কপি, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ও বিকাশ স্টেটমেন্ট।

ডিসমিসল্যাব পরীক্ষামূলকভাবে ১ হাজার ৫০ টাকা দিয়ে একটি নম্বরের ৩ মাসের সিডিআর বা কল রেকর্ড দাবি করে। মাত্র আড়াই ঘণ্টার মধ্যে হাতে আসা ফাইলে থাকা সম্প্রতি করা ২০টি কল, সময় ও কল টাইপের ১০০ ভাগ নির্ভুল হিসাব মিলে যায়। এমনকি আরেকটি সাইটে টাকা দেওয়ার মাত্র ১৬ মিনিটের মধ্যে ওই সিমটির লাইভ টাওয়ার লোকেশন, ঠিকানা এবং গুগলের ম্যাপ লিংক পর্যন্ত পাঠিয়ে দেয় তারা।

কীভাবে চলছে এই সিন্ডিকেট?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিশাল তথ্যের বাজার বিস্তৃত কত দূর? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইনে অন্তত ১০টি সক্রিয় ওয়েবসাইট, ৩৬টি ফেসবুক গ্রুপ এবং ১১২টি মোবাইল নম্বর সরাসরি এই কেনাবেচায় যুক্ত। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো—এদের বড় একটা অংশ কিন্তু সরাসরি তথ্যের মূল উৎস নয়। তারা মূলত রিসেলার বা খুচরা বিক্রেতা। চাঁদপুরের এক ওয়েবসাইট মালিক স্বীকার করেছেন—তিনি ৮০০ টাকায় কল লিস্ট কিনে ৯০০ টাকায় বিক্রি করেন। আর ৪ হাজার ৫০০ টাকায় সরবরাহ করেন বিকাশ স্টেটমেন্ট।

ধারণা করা হচ্ছে, মূল চক্রটি সরকারি সার্ভারের তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যম বা এপিআই সিকিউরিটি হ্যাক করে এই ডাটাগুলো এক্সেস করছে। ২০২৩ সাল থেকেই এই তথ্য বিক্রির পোস্ট ছড়িয়ে আছে এবং ২০২৫ সালের ইউটিউব ভিডিওগুলোতেও এসব অনৈতিক সেবার প্রচারণা চালানো হয়েছে।

মারাত্মক নিরাপত্তা ঝুঁকি

আপনার কল ডিটেলস এবং লোকেশন ট্র্যাকিং অন্যের হাতে চলে যাওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে? তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির সতর্ক করে বলেছেন—একজন মানুষ কার সাথে কথা বলছেন, কখন বলছেন, প্রতিদিন কোন কোন রুট দিয়ে যাতায়াত করছেন—সিডিআর ও লোকেশন ডাটা বিশ্লেষণ করে তার লাইফস্টাইল একদম নিখুঁতভাবে অনুমান করা সম্ভব। এর সরাসরি ঝুঁকিগুলো হলো: ব্ল্যাকমেইলিং বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কল রেকর্ড ব্যবহার করে চাঁদাবাজি। যেকোনো মুহূর্তে অপরাধীরা আপনার রিয়েল-টাইম লোকেশন জেনে বড় ধরনের অপরাধ ঘটাতে পারে। আর বিকাশ স্টেটমেন্ট ও এনআইডি দিয়ে আপনার নামে ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা বা সিম তুলে নিয়ে বড় বড় আর্থিক ফ্রড করাও বিচিত্র কিছু নয়।

একটি দেশের নাগরিকদের এনআইডি, কল রেকর্ড আর বিকাশ স্টেটমেন্ট যদি খোলা বাজারে ৫০০ টাকায় কেনাবেচা হয়, তবে সেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা বলতে আর কিছু বাকি থাকে না। সরকারি সার্ভার ও টেলিকম অপারেটরগুলোর এপিআই এবং ডাটা সিকিউরিটি কতটা ঠুনকো, এই ঘটনা তা স্পষ্ট করে দিয়েছে। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই এপিআই লিক চিহ্নিত করে দোষীদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা। আর নাগরিক হিসেবে আপনাকেও হতে হবে সচেতন—সামাজিক মাধ্যমে অপ্রয়োজনে নিজের এনআইডি, ফোন নম্বর বা পার্সোনাল ডাটা পোস্ট করা আজই বন্ধ করুন।