হঠাৎ ফকল্যান্ড নিয়ে আর্জেন্টিনা-যুক্তরাজ্য উত্তেজনা কেন, কী আছে এই দ্বীপে?

দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের এক ছোট দ্বীপপুঞ্জ, যেখানে মানুষ থাকেন মাত্র সাড়ে তিন হাজারের মতো। সেই ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ আবার বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় চলে এসেছে। চার দশক আগে এই দ্বীপ নিয়েই যুদ্ধ হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে। এতদিন পর মনে হচ্ছিল সেই পুরনো ঝামেলা থেমে গেছে। কিন্তু এখন তেল, রাজনীতি আর আমেরিকার অস্পষ্ট অবস্থানকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো বিরোধ আবার সামনে চলে এসেছে।

দ্বীপ নিয়ে ঝগড়াটা আসলে কী নিয়ে
ফকল্যান্ড দ্বীপ আর্জেন্টিনার কাছাকাছি, মাত্র কয়েকশ কিলোমিটার দূরে। অথচ এই দ্বীপ শাসন করে যুক্তরাজ্য, যাদের নিজের দেশ এখান থেকে প্রায় তেরো হাজার কিলোমিটার দূরে। এই দূরত্বই বিরোধের মূল কারণ। আর্জেন্টিনা বলে, স্পেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর এই দ্বীপ তাদেরই পাওয়ার কথা ছিল। ব্রিটেন জোর করে দ্বীপ দখল করে নিয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। অন্যদিকে যুক্তরাজ্য বলে, দ্বীপে যারা বাস করেন তাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার আছে। আর দ্বীপবাসীরা বারবার বলেছেন, তারা ব্রিটিশ শাসনেই থাকতে চান।

এই বিরোধ থেকেই ১৯৮২ সালে যুদ্ধ শুরু হয়। তখন আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার দ্বীপ দখল করে নেয়। ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার সেনা পাঠান, আর প্রায় আড়াই মাসের যুদ্ধের পর ব্রিটেন আবার দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়। এই যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা এবং ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা মারা যান। এই হারের পর আর্জেন্টিনার সামরিক সরকার ভেঙে পড়ে। আর জয়ের পর থ্যাচার হয়ে ওঠেন ব্রিটেনের এক শক্তিশালী নেতা। সেই থেকে আজও এই দ্বীপ নিয়ে আর্জেন্টিনার মানুষের মনে একধরনের কষ্ট রয়ে গেছে। এই একটা বিষয়ে দেশের সব রাজনৈতিক দলই একমত।

এত বছর পর হঠাৎ কেন এই টানাপোড়েন
এতদিন এই বিরোধ ছিল অনেকটা শান্ত। হঠাৎ কেন আবার এটা নিয়ে কথা হচ্ছে, তার পেছনে তিনটি কারণ আছে।
প্রথম কারণ তেল। দ্বীপের উত্তরে সমুদ্রের নিচে আছে 'সি লায়ন' নামের একটি তেলক্ষেত্র। ব্রিটিশ কোম্পানি রকহপার এবং ইসরায়েলি কোম্পানি নাভিতাস মিলে সেখানে কয়েক মাসের মধ্যেই তেল খোঁজার কাজ শুরু করবে। তাদের পরিকল্পনা, ২০২৮ সালের মধ্যে তেল তোলা শুরু হবে। আর্জেন্টিনার কাছে এটা শুধু একটা ব্যবসার প্রশ্ন নয়। তাদের মতে, এটা তাদের নিজেদের সম্পদ চুরির মতো ঘটনা। আর এই তেল প্রকল্প সফল হলে দ্বীপে ব্রিটেনের অবস্থান আরও শক্ত হয়ে যাবে।

ফকল্যান্ড দ্বীপ। ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

দ্বিতীয় কারণ আমেরিকার অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা। ১৯৮২ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র সবসময় বলে এসেছে, তারা এই বিরোধে কোনো পক্ষ নেবে না। তবে বাস্তবে তারা ব্রিটিশ শাসনকেই মেনে নিয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি এই অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। এপ্রিল মাসে ফাঁস হওয়া পেন্টাগনের একটি চিঠিতে জানা যায়, যেসব ন্যাটো দেশ ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমেরিকাকে সাহায্য করেনি, তাদের শাস্তি দিতে এই ফকল্যান্ড ইস্যুকে ব্যবহার করার কথা ভাবা হচ্ছিল। ট্রাম্প নিজেও স্পষ্ট করে বলেননি যে বিপদে পড়লে তিনি ব্রিটেনের পাশে দাঁড়াবেন। উল্টো তিনি ব্রিটেনের প্রতি পুরনো ক্ষোভের কথা বলেছেন। এই অনিশ্চয়তার সুযোগই নিতে চাইছে আর্জেন্টিনা।

তৃতীয় কারণ আর্জেন্টিনার নিজের রাজনীতি। প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের জনপ্রিয়তা এখন অনেক কমে গেছে। তার কড়া অর্থনৈতিক নীতির কারণে দ্রব্যমূল্য কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বেড়েছে। সরকারের ভেতরে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। আগামী বছর তাকে আবার নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হবে। এমন সময়ে মালভিনাস (দ্বীপের আর্জেন্টাইন নাম) এমন একটা বিষয়, যা নিয়ে দেশের সব রাজনৈতিক দলই একমত। তাই এই ইস্যু তুললে মানুষের সমর্থন পাওয়া সহজ। বিরোধীরা অবশ্য বলছেন, নির্বাচনের আগে মানুষের মন জয় করতেই মিলেই এই বিষয় সামনে আনছেন।

মিলেই কী কী ঘোষণা দিলেন
সম্প্রতি দেওয়া এক ভাষণে মিলেই কয়েকটি কড়া সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি বলেন, তেল প্রকল্পে যুক্ত কোম্পানি, তাদের শেয়ারহোল্ডার, পরিচালক আর সরবরাহকারীদের ওপর দ্রুত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে। এমন একটি আইনও তিনি প্রস্তাব করেন, যাতে এসব প্রতিষ্ঠান আর্জেন্টিনায় কোনো ব্যবসাই করতে না পারে। এছাড়া আর্জেন্টিনার দক্ষিণের এলাকা তিয়েরা দেল ফুয়েগোতে একটি নৌঘাঁটির জন্য বাড়তি টাকা দেওয়ার কথাও বলেন তিনি, যদিও অন্যান্য খাতে সরকার খরচ কমাচ্ছে। তবে তিনি যুদ্ধের কথা বলেননি, বরং কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের কথাই বলেছেন।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

এখানে একটা মজার বিষয় আছে। মিলেই দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে থ্যাচারের ভক্ত বলে পরিচয় দিয়ে এসেছেন এবং ব্রিটেনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখার চেষ্টা করেছেন। এ জন্য তিনি নিজের দেশেই সমালোচিত হয়েছেন। তাই তার এই হঠাৎ কড়া অবস্থান অনেকের কাছে রাজনৈতিক কৌশল বলেই মনে হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের জবাব
যুক্তরাজ্য দ্রুত ও স্পষ্ট জবাব দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, দ্বীপ নিয়ে তাদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। দ্বীপবাসীরা যা চান, সেটাই শেষ কথা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং বলেছেন, মিলেইয়ের এই বক্তব্য আসলে ফকল্যান্ড নিয়ে নয়, বরং আর্জেন্টিনার নিজের রাজনীতি নিয়েই বেশি কিছু বলে। ব্রিটিশ সরকার বলছে, তাদের অবস্থান বহুদিনের এবং অটল। এর প্রমাণ হিসেবে তারা ২০১৩ সালের একটি ভোটের কথা বলে, যেখানে প্রায় সব দ্বীপবাসীই ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন।

অন্যান্য দেশের ভূমিকা
জাতিসংঘ ফকল্যান্ডকে একটি বিশেষ অঞ্চল হিসেবে তালিকায় রেখেছে। তবে সার্বভৌমত্ব নিয়ে তারা কোনো পক্ষ নেয়নি। শুধু দুই দেশকে আলোচনায় বসতে বলেছে। এই বিরোধে বড় দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। চীন সম্প্রতি আর্জেন্টিনার সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়েছে এবং প্রকাশ্যে তাদের দাবিকে সমর্থন দিয়েছে। আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে তারা নিরপেক্ষ, কিন্তু ট্রাম্পের অস্পষ্ট কথাবার্তা পুরনো ভারসাম্যে সন্দেহ তৈরি করছে।

সামনে কী হতে পারে
এখনই সরাসরি যুদ্ধের কোনো সম্ভাবনা নেই। মিলেই নিজেই বলেছেন, শক্তি প্রয়োগ করা হবে না। তবে তিনটি বিষয় ঠিক করে দেবে এই ঘটনা কোন দিকে যাবে। এক, সি লায়ন তেল প্রকল্প কতটা এগোয়। দুই, আমেরিকা তাদের অবস্থান শেষ পর্যন্ত পাল্টায় কি না। তিন, আর্জেন্টিনার আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিক হিসাব কেমন দাঁড়ায়।

চার দশক আগের যুদ্ধ আর আজকের এই বাদানুবাদ এক জিনিস নয়। তবে এটা স্পষ্ট, পুরনো বিরোধ এখনো পুরোপুরি মিটে যায়নি। আর তেলের এই নতুন প্রশ্নই সেই পুরনো ব্যথা আবার সামনে নিয়ে এসেছে।