রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা, কেন?

চলতি বছরের এপ্রিলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হয়। সে সময় বলা হয়েছিল, সেপ্টেম্বর থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে জাতীয় গ্রিডে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—সেপ্টেম্বর তো দূরের কথা, এ বছরও বিদ্যুৎ মিলবে কি না, তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। হঠাৎ কী এমন ঘটল? কেন পারমাণবিক চুল্লির অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি যন্ত্রাংশ টেস্টে পাস করতে পারছে না? চলুন জেনে নেওয়া যাক রূপপুরের সমস্যাটি ঠিক কোথায়।

মূল সমস্যাটি ঠিক কোথায়?
রূপপুরের প্রথম ইউনিটে ৯০টিরও বেশি পরীক্ষা-নিরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলেও আটকে গেছে একটি জায়গায়! কারিগরি ভাষায় এই যন্ত্রটিকে বলা হয় ‘পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ’ বা পিওআরভি (PORV)। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় ও বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, রিয়েক্টরের ভেতরে থাকা দুটি সেফটি ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করছে না।

পারমাণবিক চুল্লির ভেতরে যখন তাপমাত্রা প্রায় ২৮০ থেকে ৩০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছায় এবং ভেতরের চাপ ১৮-এর ওপরে চলে যায়, তখন এই ভালভগুলোর কাজ হলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গিয়ে অতিরিক্ত বাষ্প বের করে দেওয়া, যাতে চুল্লির ভেতরের চাপ কমে নিরাপদ মাত্রায় চলে আসে। চাপ ঠিক হয়ে গেলে ভালভ আবার নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু রূপপুরে বারবার টেস্ট করার পরও এই ভালভ দুটি ঠিক সময়ে খুলছে না। রাশিয়ার রোসাটমের প্রধান ডিজাইনার ও বিজ্ঞানীরা এসে এটি মেরামত করার চেষ্টা করলেও এখনো সমাধান মেলেনি।

সেফটি ভালভ চুল্লির হৃৎপিণ্ড?
অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন—একটি ছোট ভালভ খুলছে না তো কী হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করে দেওয়া যায় না? পরমাণু বিজ্ঞানীরা বলছেন, একদমই না। কারণ, এটি হলো পারমাণবিক চুল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থার হৃৎপিণ্ড বা হার্ট। পানির প্রবাহ এবং ভেতরের চাপ নিয়ন্ত্রণ না হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এর ইতিহাস অত্যন্ত করুণ। আপনারা কি ১৯৭৯ সালের যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘থ্রি মাইল আইল্যান্ড’ পারমাণবিক দুর্ঘটনার কথা জানেন?

সেদিনও এই পিওআরভি ভালভটি খোলা অবস্থায় আটকে গিয়েছিল। অপারেটররা বুঝতে পারেননি যে প্ল্যান্ট ঠান্ডা করার পানি বের হয়ে যাচ্ছে। আর তার ফলেই যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পারমাণবিক দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। তাই রূপপুরের 'ভিভিআর-১২০০' মডেলে ৩টি ব্যাকআপ ভালভ রাখা হলেও, কোনো একটিতে ত্রুটি থাকলে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) বা বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ চালুর লাইসেন্স দেবে না।

সমাধান তবে কী?
এখন প্রশ্ন হলো—এই জটিলতার সমাধান কী? যদি বর্তমান ভালভ দুটি মেরামত করে শতভাগ নিখুঁত করা সম্ভব হয়, তবে হয়তো দ্রুত সমাধান মিলবে। কিন্তু তা না হলে রাশিয়া থেকে একেবারে নতুন করে স্পেশাল ডিজাইনের ভালভ বানিয়ে আনতে হবে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের পারমাণবিক যন্ত্রাংশ বাজারে চাইলেই কিনতে পাওয়া যায় না; বিশেষ অর্ডারে এগুলো বানাতে হয়। নতুন ভালভ বানিয়ে আনতে হলে এর পেছনে আরও কয়েক মাস বা অনেক সময় লেগে যেতে পারে।

তা ছাড়া এই ত্রুটি কাটানোর পর শুরু হবে ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট, টারবাইন, জেনারেটর এবং জাতীয় গ্রিডের সাথে সিনক্রোনাইজেশন পরীক্ষা। বিদ্যুৎ বিপর্যয় হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করে কি না—এমন শত শত কঠিন পরীক্ষায় পাস করার পরই কেবল পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া সম্ভব।

বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে যত বিতর্ক
পরমাণু বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি লোড করার পর রাশিয়ার ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রোসাটমের সঙ্গে ‘নিউক্লিয়ার পাওয়ার ইউনিট কমিশন শিডিউল’ নামে একটি স্পষ্ট চুক্তি থাকা প্রয়োজন—যেখানে লেখা থাকে কোনো ধাপে দেরি হলে তার জন্য কে কত টাকা ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে সরকারের কাছে এই ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট চুক্তির স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়নি।

অন্য আরেকটি বড় সমস্যা হলো তথ্যের অভাব। রূপপুরের মতো স্পর্শকাতর প্রকল্পে কী হচ্ছে, কেন দেরি হচ্ছে—তা সাধারণ মানুষকে জানাতে নিয়মিত কোনো মিডিয়া সেল নেই। তথ্য না থাকার কারণে জনগণের মনে উৎকণ্ঠা, হতাশা ও নানা গুঞ্জন তৈরি হচ্ছে।

কবে মিলবে বিদ্যুৎ?
তাহলে শেষ পর্যন্ত কবে নাগাদ রূপপুর থেকে বিদ্যুৎ পাচ্ছে বাংলাদেশ? বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে—যেহেতু বিষয়টি নিরাপত্তা সংক্রান্ত, তাই কোনো নির্দিষ্ট তারিখ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তাড়াহুড়ো করে পরমাণুকেন্দ্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

রাশিয়ার সঙ্গে মূল চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালে এই কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আসার কথা ছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে প্রকল্পের গতি কিছুটা কমেছে। তবে গবেষকদের মতে, জ্বালানি লোড করার পর সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ করে পূর্ণ শক্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যেতে অন্তত ১০ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের সংকটের এই সময়ে রূপপুরের উৎপাদন শুরু হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি হলেও নিরাপত্তার চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না।