ট্রেনের ছাদ থেকে গায়েব ২ লাখ টাকার যন্ত্র

ভেবে দেখুন তো, চলন্ত ট্রেনে বসে হাই-স্পিড ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন—কোনো বাফারিং নেই, নেটওয়ার্ক ড্রপ নেই। শুনতে চমৎকার লাগছে, তাই না? ঠিক এই লক্ষ্য নিয়েই দেশের চার জোড়া আন্তনগর ট্রেনে শুরু হয়েছিল স্যাটেলাইটভিত্তিক ‘স্টারলিংক’ ইন্টারনেটের সেবা। কিন্তু সেবা চালু হতে না হতেই ঘটে গেল এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড। দামি এ রাউটারগুলো একে একে হাওয়া হয়ে যেতে লাগল। কীভাবে ঘটল এই ঘটনা? কেন নিরাপদ রাখা গেল না সরকারি এই উদ্যোগ?

উদ্যোগের পেছনের গল্প
ঘটনার গোড়ায় যাওয়া যাক। চলতি বছরের ১৩ মার্চ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ পরীক্ষামূলকভাবে এই সার্ভিস চালু করে। এতে কারিগরি সহায়তা দেয় বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিএল)। উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট ছিল—দূরপাল্লার ট্রেনযাত্রায় স্টারলিংকের স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক কতটা কার্যকর এবং এটি দীর্ঘমেয়াদে চালানো সম্ভব কি না, তা পরখ করা। প্রাথমিকভাবে পর্যটক, পারাবত, উপবন ও বনলতা এক্সপ্রেসের বগিতে প্রায় ৬০টি রাউটার বসানো হয়। যাত্রীরা বিনামূল্যে হাই-স্পিড ওয়াই-ফাই পাচ্ছিলেন, সাড়াও মিলছিল দারুণ।

ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ
কিন্তু আনন্দের দিন বেশি দিন টিকল না। গত রোজার ঈদের পর থেকেই শুরু হলো একের পর এক চুরির ঘটনা। শুরুতে প্রতিটি বগিতে দুটি করে রাউটার দেওয়া হয়েছিল। চোরের উপদ্রব বাড়তে থাকায় বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ বগিতে রাউটার কমিয়ে একটি করে দেয়। চুরি হওয়া যন্ত্র বারবার নতুন করে বসানো হলেও রক্ষা মেলেনি। চোরেরা শুধু রাউটারই নয়, সাথে থাকা সংযোগ তার ও কেবল চ্যানেলিং পর্যন্ত উপড়ে নিয়ে গেছে।

পরিসংখ্যানটা শুনলে অবাক হবেন—৬০টি রাউটারের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ১৫টি। অর্থাৎ ৪৫টি রাউটারই হাওয়া। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা আসে সম্প্রতি, যখন ঢাকা-সিলেট রুটের উপবন এক্সপ্রেসের স্টারলিংক সিগন্যাল বন্ধ হয়ে যায়। বিএসসিএলের একটি টিম সরেজমিনে গিয়ে দেখে—ট্রেনের ছাদ থেকে পুরো অ্যান্টেনাটাই উধাও। সেখানে পড়ে আছে শুধু অ্যান্টেনা বসানোর ধাতব হোল্ডার। বিএসসিএলের হিসাব অনুযায়ী, একেকটি রাউটারের দাম ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা, আর চুরি যাওয়া অ্যান্টেনাটির দাম ছিল ২ লাখ টাকারও বেশি।

কারা করছে এই কাজ?
প্রশ্ন হচ্ছে—চলন্ত ট্রেন বা স্টেশনের মতো জায়গায় এত নিরাপত্তার মাঝেও এগুলো চুরি করছে কে? রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে কিছু বলতে না পারলেও বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সংকেত ও টেলিযোগাযোগ প্রকৌশলী জানান, চলন্ত ট্রেনে এ ধরনের চুরি নিয়মিতই ঘটে। অনেক সময় দেখা যায়, মাদকাসক্ত ব্যক্তিরা ধাতব কোনো যন্ত্র দেখে এর সঠিক দাম না জেনেই চুরি করে এবং সামান্য টাকার বিনিময়ে বাইরে বিক্রি করে দেয়।

ইতিমধ্যেই নিরাপত্তা বাহিনী কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং পুলিশ প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষণিক তদারকি বাড়ানো হয়েছে। বিএসসিএলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) স্পষ্ট জানিয়েছেন, যন্ত্রপাতি চুরি ঠেকানো না গেলে এমন বিশ্বমানের সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে দেওয়া মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

নতুন মাস্টারপ্ল্যান
তবে আশার কথা হলো—এই ঘটনায় সেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। চুরি ঠেকাতে পুরো পদ্ধতির পরিবর্তন আনছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টার ভাষ্যমতে, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে রেলে যুক্ত হতে যাওয়া নতুন ৫০টি বগির ভেতরে এমনভাবে রাউটারগুলো সেট করা হবে, যেন তা বগির মূল কাঠামোর সঙ্গে সুরক্ষিত থাকে এবং সহজে খোলা না যায়। আর মূল অ্যান্টেনাটি সাধারণ কোনো বগির ছাদে না রেখে সরাসরি ইঞ্জিন বগির ছাদে স্থাপন করা হবে—যেখানে সার্বক্ষণিক রেলকর্মীদের নজরদারি থাকে।

যাত্রীদের সুবিধার জন্য নেওয়া একটি উদ্যোগ যখন নাগরিকদের অসচেতনতা কিংবা চুরির কারণে ভেস্তে যেতে বসে, তখন বিষয়টায় সত্যিই দুঃখ প্রকাশ ছাড়া উপায় থাকে না। এ ধরনের সরকারি সম্পদ রক্ষায় কর্তৃপক্ষের নজরদারির পাশাপাশি আমাদের সাধারণ সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি।