৩ নভেম্বর নিয়ে কেন সতর্ক ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরছে?

গত সপ্তাহ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও ইরানের মধ্যে আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা তীব্র হয়েছে। কিন্তু রণক্ষেত্রের এই বারুদের ধোঁয়ার ভেতরেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বিশেষ তারিখের প্রভাব, ৩ নভেম্বর। এ দিনটিতে আমেরিকায় হতে যাচ্ছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। আর এটিই এখন ইরান যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার প্রধান চালিকাশক্তি। কেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টারা চান না, ভোটের আগে এই সংঘাত পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিক? ট্রাম্পের দল কি যুদ্ধকে ভয় পাচ্ছে? চলুন বোঝার চেষ্টা করি, কীভাবে যুদ্ধ না থামিয়েও অর্থনৈতিক ফাঁদে ইরানকে পিষে মারার ছক কষছে ওয়াশিংটন!

চার সপ্তাহের যুদ্ধ যখন সাত মাসের অভিশাপ
একটু পেছনের দিকে ফেরা যাক। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়। মার্চের শুরুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ঘোষণা করেছিলেন—এই যুদ্ধ বড়জোর চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ স্থায়ী হবে। কিন্তু বাস্তবতা কী বলছে? যুদ্ধ আজ সাত মাসে গড়িয়েছে, এবং শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। উল্টো ইরানের মোক্ষম চালে বৈশ্বিক অর্থনীতি এখন তছনছ। তেহরান হরমুজ প্রণালি অবরুদ্ধ করায় বিশ্বজুড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে তেলের দাম।

যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম এতটাই বেড়েছে যে, গত বৃহস্পতিবার দেশটিতে ডিজেলের দাম ২০২২ সালের সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। আর এতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় বড়সড় ধস নেমেছে। ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জীবনযাত্রার খরচ কমাবেন এবং দেশকে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ থেকে দূরে রাখবেন। আজ তাঁর আমলেই তেলের দাম এবং মূল্যস্ফীতি রেকর্ড গড়েছে।

জনমতে বড় ধাক্কা
আগামী ৩ নভেম্বর মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার লড়াইয়ে নামছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি। বর্তমানে খুব সামান্য ব্যবধানে তারা এগিয়ে আছে। কিন্তু সম্প্রতি রয়টার্স ও ইপসোসের জরিপ বলছে—মাত্র ৩১ শতাংশ মার্কিন নাগরিক এই ইরান যুদ্ধকে সমর্থন করছেন, যেখানে ৬৩ শতাংশ সরাসরি যুদ্ধের বিরুদ্ধে। আর এর প্রভাবে ট্রাম্পের নিজের গ্রহণযোগ্যতা ৪০ শতাংশ থেকে একধাক্কায় ৩৩ শতাংশে নেমে এসেছে!

পলিটিকোর আরেক জরিপে দেখা গেছে, ৬১ শতাংশ সাধারণ আমেরিকান মনে করছেন ইরান যুদ্ধের কারণেই তাদের পকেটের টান পড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। বিরোধীরা অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা এখন এই জীবনযাত্রার ব্যয় বা মূল্যস্ফীতিকেই তাদের প্রধান নির্বাচনী হাতিয়ার বানিয়েছে। তাই ট্রাম্প প্রশাসন ভয় পাচ্ছে—ভোটের আগে যুদ্ধ যদি আরও ছড়িয়ে পড়ে, তবে মার্কিন ভোটাররা ব্যালট বাক্সে ট্রাম্পের দলকে চরম শাস্তি দিতে পারে।

'যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়'
এই রাজনৈতিক বিপর্যয় সামলাতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন এক অদ্ভুত কৌশল নিয়েছে—কূটনৈতিক ভাষায় যাকে বলা যায় 'যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়' অবস্থান। তারা পূর্ণ সামরিক শক্তি ব্যবহার না করে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে। গত মাসেই ইরানের তেল বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ৬০টি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালিতে নৌ-অবরোধ বহাল রাখা হয়েছে।

এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বিষয়টির গুরুত্ব কমিয়ে দেখানোর চেষ্টা করছেন। এক ব্রিফিংয়ে তো তিনি বলেই বসলেন, এটি নাকি কোনো যুদ্ধই নয়! কারণ সেখানে সরাসরি গোলাগুলি চলছে না। তবে এই মিষ্টি কথার আড়ালে রক্ত ঝরা বন্ধ হয়নি। চলতি সপ্তাহে দক্ষিণ ইরানের কুহেস্তাকে একটি বিয়েবাড়িতে মার্কিন হামলায় শিশুসহ চারজন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে সতর্ক করে বলেছেন—ইরানের সঙ্গে এইভাবে যুদ্ধ টেনে নিয়ে যাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য টেকসই নয়।

তেহরান কী করবে?
মার্কিন প্রশাসন ভাবছে তারা কৌশলগতভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু ইরানও বসে নেই। তেহরান বেশ ভালো করেই জানে—নভেম্বর পর্যন্ত অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে নির্বাচন পার করাই ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্য। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ত্রিতা পারসি বলছেন, ইরানের কর্মকর্তারা মনে করছেন, ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে জিতলেই ট্রাম্প আবার পুরোদমে ইরানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন।

তাহলে তেহরানের কৌশল কী হতে পারে? ইরানিরা ভাবতেই পারে—ট্রাম্প যখন রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে বেশি নাজুক এবং ব্যাকফুটে আছেন, ঠিক এই ৩ নভেম্বরের আগেই বড় ধরনের সংঘাত বা সামরিক জবাব দেওয়া তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক। যদি ইরান তাদের সস্তা ড্রোন ও মিসাইল দিয়ে মার্কিন ঘাঁটি বা তেলের ট্যাংকারে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে দেয়, তবে বাধ্য হয়ে ট্রাম্পকে ভোটের আগেই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে নামতে হবে—যা রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য হবে আত্মঘাতী।

ভোটের পর কী হতে যাচ্ছে?
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্তারা আলোচনা করছেন, ৩ নভেম্বরের ভোটের পর ইরানের ওপর কীভাবে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করা যায়। যদি নির্বাচনে ট্রাম্পের দল জিতে যায়, তবে ট্রাম্প ইরানকে ধ্বংস করার নতুন সবুজ সংকেত পেয়ে যাবেন। আর যদি ডেমোক্র্যাটরা জেতে অর্থাৎ ট্রাম্পের দল হেরে যায়? তবে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে কোনঠাসা হয়ে পড়া ট্রাম্প আরও বেশি বেপরোয়া ও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারেন। অর্থাৎ নভেম্বরের পর জয়-পরাজয় যা-ই হোক, ইরান যুদ্ধের তীব্রতা বহু গুণে বেড়ে যাওয়ার পথেই যাচ্ছে।

একটি বিষয় পরিষ্কার—যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচন শুধু আমেরিকার ভাগ্য নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।