ইরানের হামলার ভয়ে ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ বন্ধ করছে মার্কিন বাহিনী

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। একদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের সদস্যদের অবস্থান যেন বাণিজ্যিক ডেটা থেকে শনাক্ত করা না যায়, সে জন্য সরকারি ডিভাইসে বিজ্ঞাপন-ভিত্তিক ট্র্যাকিং বন্ধ করছে। অন্যদিকে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে ইরান নতুন করে ‘সীমিত অঞ্চল’ বা এক্সক্লুশন জোন তৈরির ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে চলছে পাল্টাপাল্টি হামলা, তেলবাহী জাহাজকে ঘিরে উত্তেজনা এবং নতুন অর্থনৈতিক চাপ। তাহলে পরিস্থিতি এখন ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে? চলুন সহজভাবে বোঝা যাক।

কেন ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ বন্ধ করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী?

আমরা যখন মোবাইল বা কম্পিউটারে বিভিন্ন অ্যাপ ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করি, তখন বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য কিছু ডিভাইস-সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হতে পারে। এর মধ্যে থাকতে পারে মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি বা এমএআইডি– যা বিজ্ঞাপনদাতাদের ব্যবহারকারীর কার্যকলাপ ও অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে কাজে লাগে। সমস্যা হলো, এই ধরনের বাণিজ্যিক লোকেশন ডেটা বিভিন্ন ডেটা ব্রোকারের মাধ্যমে হাতবদল হতে পারে। মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শত্রুপক্ষ এই তথ্য ব্যবহার করে বিদেশে থাকা মার্কিন সেনাদের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে।

এই ঝুঁকি কমাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরকারি ডিভাইসগুলোতে ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ বন্ধ বা সীমিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। আর্মি, এয়ারফোর্স, নেভি, মেরিন কর্পস এবং স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের ডিভাইসও এর আওতায় রয়েছে। তবে একটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ– অ্যাড আইডি বন্ধ করলেই যে কোনো ডিভাইসকে আর ট্র্যাক করা যাবে না, বিষয়টি এমন নয়। নেটওয়ার্ক, সেলুলার তথ্য বা অন্যান্য ডিজিটাল সিগন্যাল থেকেও অবস্থান সম্পর্কে তথ্য পাওয়া সম্ভব। অর্থাৎ এটি ঝুঁকি কমানোর একটি পদক্ষেপ, তবে একেবারেই অবস্থান শনাক্ত করা যাবে না এমন নয়।

হরমুজ ঘিরে ইরানের নতুন হুঁশিয়ারি

এবার আসা যাক হরমুজ প্রণালিতে। ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে নতুন হামলা হলে তাদের প্রতিক্রিয়া আরও দ্রুত ও কঠোর হবে। এর পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালির বাইরে পারস্য উপসাগরের একটি এলাকায় নতুন ‘এক্সক্লুশন জোন’ বা সীমিত অঞ্চল ঘোষণা করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তেহরান। ইরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই এলাকায় প্রবেশকারী জাহাজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে এই অঞ্চলের সুনির্দিষ্ট সীমানা ও নিয়ম এখনো পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। আর এখানেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ– কারণ হরমুজ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রের বিষয় নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ।

হরমুজ প্রণালি এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?

হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও জ্বালানি পণ্য পরিবহন হতো। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সংঘাত শুরু হওয়ার পর এই রুটে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ, পরিবহন খরচ এবং জ্বালানির দাম নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ হরমুজে উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও– জ্বালানি থেকে শুরু করে পরিবহন ও পণ্যের দামে।

তাহলে যুদ্ধ এখন কোন অবস্থায়?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলা শুরুর প্রায় ছয় মাস পরও সংঘাতের স্থায়ী সমাধান হয়নি। জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতা হয়েছিল। এতে কিছু সময়ের জন্য বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা কমে আসে। কিন্তু সেই সমঝোতা টেকেনি। আগস্টে প্রায় এক মাস তুলনামূলকভাবে কম উত্তেজনার পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে আবার সরাসরি হামলা-পাল্টা হামলা বেড়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে ইরানও মার্কিন নৌযানে হামলার দাবি করেছে।

ইরানের সামনে আরেক বড় চাপ

সামরিক চাপের পাশাপাশি ইরানকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকটও। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে বাধা এবং যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে। ইরানি কর্মকর্তারাও এখন অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন সংঘাত চললে মুদ্রাস্ফীতি, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ যুদ্ধটা শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধজাহাজের নয়– এটি অর্থনীতির লড়াইটাকেও আরও তীব্র করছে।

তাহলে সামনে কী?

সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন অন্তত তিনটি ফ্রন্টে চলছে– সামরিক সংঘাত, তথ্য ও প্রযুক্তির লড়াই এবং অর্থনৈতিক চাপ। মার্কিন বাহিনী একদিকে নিজেদের ডিজিটাল অবস্থান ফাঁসের ঝুঁকি কমাচ্ছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। আর এর মধ্যেই কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনো অনিশ্চিত। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো– হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কি আরও বাড়বে, নাকি নতুন করে আলোচনার পথ খুলবে?

কারণ এই সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, এর প্রভাব তত বেশি ছড়িয়ে পড়বে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে– বিশ্বের তেলবাজার, পরিবহন খরচ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। তাই আগামী কয়েক দিন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।