৯/১১ যেভাবে বদলে দিয়েছে পুরো বিশ্ব

একটা সকাল। চারটি বিমান। কয়েক ঘণ্টায় বদলে গেল পুরো পৃথিবী। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর। নিউইয়র্কের আকাশে একটি বিমান আঘাত করল ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের টুইন টাওয়ারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতীয় বিমান আছড়ে পড়ে অন্য টাওয়ারে। আরেকটি বিমান আঘাত করল পেন্টাগনে। চতুর্থ বিমানটি যাত্রীদের প্রতিরোধের পর পেনসিলভানিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। একদিনে প্রাণ হারান ২,৯৭৭ জন। 

কিন্তু ৯/১১-এর প্রভাব শুধু সেই দিনের মৃত্যুতেই থেমে থাকেনি। এর পরের ২৫ বছর ধরে যুদ্ধ, রাজনীতি, প্রযুক্তি, নজরদারি আর সংবাদমাধ্যম—সবকিছুর ওপর পড়েছে এর গভীর ছাপ। চলুন জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে ৯/১১ এর ঘটনা বদলে দেয় পুরো বিশ্বকে।

পৃথিবী প্রথমবার একসঙ্গে দেখল ভয়াবহতা

৯/১১ এমন এক সময়ে ঘটে, যখন ইন্টারনেট, ডিজিটাল ক্যামেরা আর স্যাটেলাইটভিত্তিক টেলিভিশন দ্রুত বিকশিত হচ্ছিল। ফলে নিউইয়র্কে যা ঘটছিল, তা শুধু আমেরিকা দেখেনি। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে সেই দৃশ্য দেখেছে। সেদিন প্রায় দুই বিলিয়ন মানুষ সরাসরি বা পরবর্তী সংবাদ সম্প্রচারের মাধ্যমে হামলার ছবি দেখেছিল, যেটি তৈরি করেছিল এক নতুন বাস্তবতা- গ্লোবাল সাইমালটেনিয়িটি। অর্থাৎ, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ একই মুহূর্তে একই ঘটনার দর্শক হয়ে গেল।

বদলে গেল সংবাদমাধ্যম

৯/১১ সাংবাদিকতার ধরনও পাল্টে দেয়। পেশাদার ফটোগ্রাফারদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ছবি তুলতে শুরু করেন। ব্লগ, ওয়েবসাইট, মোবাইল ফোন আর কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আজ কোনো বড় ঘটনা ঘটলেই আমরা অসংখ্য নাগরিকের ছবি ও ভিডিও আশা করি। এই সংস্কৃতির শিকড় অনেকটাই খুঁজে পাওয়া যায় ৯/১১-এর সেই দিনটিতে। ডিজিটাল ফটোগ্রাফিও তখন এক বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফিল্মের বদলে মেমোরি কার্ড। ছবি তোলা, সংরক্ষণ করা এবং পাঠানো—সবকিছুই হচ্ছিল অনেক দ্রুত।

শুরু হয় ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’

৯/১১-এর সবচেয়ে বড় ভূ-রাজনৈতিক পরিণতিগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ। ২০০১ সালে আফগানিস্তানে অভিযান শুরু হয় আল-কায়েদা ও তাদের আশ্রয়দাতা তালেবানকে লক্ষ্য করে। ২০০৩ সালে শুরু হয় ইরাক যুদ্ধ। কিন্তু ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের যে মজুতের কথা বলা হয়, শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ধীরে ধীরে যুদ্ধের খরচ বাড়ে, বাড়ে হতাহত। আর বিশ্বের অনেক জায়গায় আমেরিকার প্রতি যে সহানুভূতি ৯/১১-এর পর তৈরি হয়, তার বড় অংশই ক্ষয়ে যায়।

নিরাপত্তার নামে বাড়ল নজরদারি

৯/১১-এর পর আমেরিকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আসে বিশাল পরিবর্তন। পাসপোর্ট, বিমানবন্দর, সীমান্ত, ফোন, ই-মেইল- সবকিছুর ওপর নজরদারি বাড়তে থাকে। প্যাট্রিয়ট অ্যাক্ট এবং পরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ব্যবস্থার বিস্তার আমেরিকান সমাজে নিরাপত্তা বনাম ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিতর্ককে নতুন মাত্রা দেয়। আর আজ? ফেসিয়াল রিকগনিশন, সার্ভেইলেন্স ক্যামেরা,  স্মার্টফোন, এমনকি এআই। প্রযুক্তি আমাদের নিরাপত্তা বাড়িয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও তুলেছে, আমরা কতটা নিরাপদ, আর কতটা নজরবন্দি?

প্রযুক্তি বদলেছে প্রতিবাদও

৯/১১-এর পরের দশকে ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০১০ সালের আরব বসন্তে ফেসবুক, ইউটিউব ও টুইটার বিভিন্ন আন্দোলনকারীদের সংগঠিত হতে এবং বিশ্বের কাছে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রযুক্তির অন্য দিকও আছে। যে প্ল্যাটফর্ম প্রতিবাদ সংগঠিত করতে পারে, সেটিই আবার সরকারকে আন্দোলনকারীদের নজরদারি করতেও সাহায্য করতে পারে। যে প্রযুক্তি সত্যের ছবি ছড়িয়ে দেয়, সেটিই আবার প্রচার, বিভ্রান্তি এবং মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

সবচেয়ে বড় সংকট- কোনটা সত্য?

২০০১ সালে একটি ছবি দেখলে মানুষ সেটিকে বাস্তব ঘটনার প্রমাণ হিসেবে বিশ্বাস করত। কিন্তু ২০২৬ সালে পরিস্থিতি অনেক জটিল। কারণ এখন নতুন এক বাস্তবতার নাম ‘ডিপফেক’। এআই-তৈরি ছবি, ভুয়া খবর, ভাইরাল মিমের কারণে বাস্তব ছবিও এখন সন্দেহের মুখে।

৯/১১ আমাদের এমন একটি পৃথিবীর দিকে ঠেলে দিয়েছে, যেখানে আমরা একই সঙ্গে আরও বেশি কানেকটেড এবং আরও বেশি বিভ্রান্ত। সেদিন পৃথিবী একসঙ্গে তাকিয়েছিল নিউইয়র্কের দিকে। মানুষ কেঁদেছিল, সহানুভূতি জানিয়েছিল, একে অন্যের আরও কাছাকাছি এসেছিল। 

কিন্তু সেই একই ঘটনার পর শুরু হয়েছে দীর্ঘ যুদ্ধ, ব্যাপক নজরদারি, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং তথ্যযুদ্ধের নতুন যুগ। তাই ৯/১১ শুধু একটি সন্ত্রাসী হামলার নাম নয়। এটি একটি ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’, অর্থাৎ, যে মুহূর্তের আগে এবং পরে পৃথিবীকে আর এক রকম দেখায় না, যার ধাক্কায় বদলে গিয়েছিল যুদ্ধের ধরন, সংবাদমাধ্যমের ভাষা, প্রযুক্তির ব্যবহার, রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং সত্যকে দেখার চোখ।

তাই ২৫ বছর পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটা নয় যে, ৯/১১-এ কী ঘটেছিল। বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সেদিনের পর আমরা যে পৃথিবী তৈরি করেছি, সেটি কি সত্যিই আগের পৃথিবীর চেয়ে নিরাপদ? নাকি আমরা কেবল ভয়কে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রযুক্তিভিত্তিক একটি মাধ্যম তৈরি করেছি মাত্র?