বাংলাদেশের মাদক সমস্যার আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আসে সীমান্তের কথা। ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসত ফেনসিডিল, ইয়াবাসহ নানা ধরনের মাদক। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। শুধু সীমান্ত পেরিয়ে মাদক আসছে না, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশেই মিলছে মাদক তৈরির গোপন ল্যাব ও কারখানা। ইয়াবা, কেটামিন, কুশ থেকে ভেজাল মদ—আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটেও চলছে এসব উৎপাদনের অভিযোগ।
কোথায় মিলেছে মাদক কারখানা?
রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশে মিনি ল্যাব বসিয়ে বিভিন্ন ধরনের মাদক তৈরি করছে, এমন বিভিন্ন চক্রের সন্ধান পেয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)। চলতি বছরের শুরু থেকেই রাজধানী ও আশপাশে একের পর এক মিনি ল্যাবের সন্ধান পায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। জানুয়ারিতে ওয়ারীর একটি বাসায় পাওয়া যায় কুশ চাষের নিয়ন্ত্রিত ল্যাব। একই সময়ে ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় ভেজাল মদ তৈরি ও বোতলজাত করার কারখানা।
ফেব্রুয়ারিতে গাজীপুরের টঙ্গীতে ধরা পড়ে ইয়াবা তৈরির ল্যাব। মার্চে উত্তরার একটি ফ্ল্যাটে পাওয়া যায় কেটামিন প্রক্রিয়াজাত করার মিনি ল্যাব। আর জুলাইয়ের শেষ ও আগস্টের শুরুতে কেরানীগঞ্জে একাধিক ইয়াবা তৈরির কারখানার সন্ধান পায় র্যাব। ডিএনসি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, মাদক উৎপাদনের ধরন এখন শুধু পাচারনির্ভর নয়, প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে স্থানীয় পর্যায়েও উৎপাদনের অভিযোগ সামনে আসছে।
আবাসিক ফ্ল্যাটই যখন কারখানা
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব কারখানার অনেকগুলোই গড়ে উঠেছে সাধারণ আবাসিক ভবনে। বসুন্ধরার একটি ফ্ল্যাটের একাধিক কক্ষ ব্যবহার করা হচ্ছিল ভেজাল মদ তৈরি, বোতলজাত ও সংরক্ষণের কাজে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতল ব্যবহার করে সেগুলো বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে। ওয়ারীর একটি বাসায় আবার কৃত্রিম আলো ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ বিশেষ পরিবেশ তৈরি করে কুশ চাষ করা হচ্ছিল।
ভাটারায় ভেজাল মদের কারখানা
৭ জানুয়ারি ভাটারার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও জোয়ারসাহারায় অভিযান চালিয়ে একটি ফ্ল্যাটে ভেজাল মদের মিনি ল্যাবের সন্ধান পায় ডিএনসি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্ল্যাটটির একাধিক কক্ষে ভেজাল মদ প্রস্তুত, বোতলজাত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বোতলে ভেজাল মদ ভরে সিল লাগিয়ে বাজারজাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযান থেকে ভেজাল মদ, বিদেশি মদ, বিয়ার ও ওয়াইনসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ও সংরক্ষিত তরল ‘ওয়াশ’ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ইয়াবা এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই
ফেব্রুয়ারিতে টঙ্গীর একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে প্রায় সাড়ে চার হাজার ইয়াবা, কাঁচামাল ও তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে ডিএনসি। গ্রেপ্তার করা হয় ল্যাবের মালিককে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, আগে একটি আয়ুর্বেদিক ল্যাবে কেমিস্ট হিসেবে কাজ করতেন ওই ব্যক্তি। সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পরে ইয়াবা উৎপাদনে যুক্ত হন। উদ্ধার করা তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা গুঁড়া করে রং ও বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে নতুন ট্যাবলেট তৈরির চেষ্টা চলত।
কেরানীগঞ্জেও জুলাইয়ের শেষ দিকে একটি ইয়াবা কারখানার সন্ধান পায় র্যাব। পরে আরও দুটি উৎপাদন ইউনিটের তথ্য প্রকাশ করা হয়।
উত্তরায় কেটামিনের মিনি ল্যাব
২৫ মার্চ উত্তরার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে কেটামিন প্রক্রিয়াজাত করার মিনি ল্যাবের সন্ধান পায় ডিএনসি। সেখান থেকে ছয় কেজির বেশি কেটামিন উদ্ধারের পাশাপাশি চীনের তিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই চক্র শুধু ঢাকায় কেটামিন প্রক্রিয়াজাত করেই থেমে ছিল না। আন্তর্জাতিক কুরিয়ার ব্যবহার করে বিদেশে মাদক পাঠানোরও চেষ্টা করছিল তারা। এ ঘটনায় তরল কেটামিন সরবরাহের অভিযোগে দুজন ওষুধ বিক্রেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
চিকিৎসায় চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত কেটামিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাউডারে রূপান্তর করে মাদক হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
ডিএনসির তথ্য অনুযায়ী, চক্রটি কুরিয়ারের মাধ্যমে মালয়েশিয়া, দুবাই ও শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর পরিকল্পনা বা কার্যক্রম চালাত। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে অর্ডার নেওয়া এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।
ওয়ারীতে কুশের নিয়ন্ত্রিত ল্যাব
ওয়ারীর একটি বাসায় বিদেশে শেখা পদ্ধতি ব্যবহার করে কুশ চাষের ল্যাব স্থাপনের অভিযোগ ওঠে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ৭ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে সেখানে কুশের বীজ, চাষ করা গাছ ও বিভিন্ন উপকরণ উদ্ধার করে ডিএনসি। কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাসার ভেতর ও ছাদে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ বিশেষ পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ওই ব্যক্তিকে সহায়তার অভিযোগে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নতুন চ্যালেঞ্জ
এসব ঘটনায় দেশি-বিদেশি নাগরিকের সম্পৃক্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের তথ্য সামনে এসেছে। স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা, অনলাইনভিত্তিক অর্ডার ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে বদলে যাচ্ছে মাদক ব্যবসার ধরন।
সীমান্ত দিয়ে মাদক ঢোকা বাংলাদেশের পুরোনো সমস্যা। কিন্তু নতুন বাস্তবতা হলো, মাদকের কিছু অংশ এখন রাজধানীর কাছেই ছোট ছোট ল্যাব ও কারখানায় তৈরি বা প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে।
আবাসিক ভবনের আড়ালে গড়ে ওঠা এসব নেটওয়ার্ক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো, অভিযানে ধরা পড়া কয়েকটি কারখানার বাইরেও রাজধানী ও আশপাশে এমন আরও কত গোপন মিনি ল্যাব সক্রিয় আছে?