দেশের অর্থনীতির মূল হৃৎস্পন্দন বলা হয় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগই পরিচালিত হয় এই এক বন্দর দিয়ে। কিন্তু সম্প্রতি এই চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে তৈরি হয়েছে বড় এক আলোচনা ও বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে—চট্টগ্রাম বন্দরের একের পর এক টার্মিনাল কি শেষ পর্যন্ত বিদেশিদের হাতেই চলে যাচ্ছে?
পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল থেকে শুরু করে এবার নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বা এনসিটি, সিসিটি কিংবা জেনারেল কার্গো বার্থ—সবগুলোতেই বিদেশি অপারেটর নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। একদিকে সরকারের যুক্তি—বিদেশি বিনিয়োগ ও উন্নত প্রযুক্তিতে বন্দরের দক্ষতা বহুগুণ বাড়বে।
অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি—এই সিদ্ধান্তে ক্ষুণ্ন হতে পারে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনীতি, সৃষ্টি হতে পারে বিশাল কর্মসংস্থানের ঝুঁকি। আসল ঘটনা কী? কোন চুক্তিতে কী শর্ত রয়েছে, আর কেনই বা চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি কঠোর আন্দোলনে নেমেছে? চলুন পুরো বিষয়টির সহজ ব্যাখ্যায় যাওয়া যাক।
বন্দরের কোন টার্মিনাল কার হাতে?
ঘটনার শুরুটা একটু পেছন থেকে বোঝার চেষ্টা করা যাক। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি প্রধান কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে—এনসিটি, সিসিটি, জিসিবি এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল বা পিসিটি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ২২ বছরের চুক্তিতে পতেঙ্গা টার্মিনালকে তুলে দেওয়া হয় সৌদি আরবের ‘রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ইন্টারন্যাশনাল’ (আরএসজিটিআই)-এর হাতে, যা তারা বর্তমানে পরিচালনা করছে। এছাড়া ঢাকার কাছে পানগাঁও আইসিডি পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে সুইজারল্যান্ডের ‘মেডলগ’ এবং লালদিয়ার চরের দায়িত্ব ৩০ বছরের জন্য পেতে যাচ্ছে ডেনমার্কের ‘এপিএম টার্মিনালস’।
অন্যদিকে, বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম টার্মিনাল হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। ২০২৫ সালের হিসেব অনুযায়ী, বন্দরের প্রায় ৪৪ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয় এই একটি টার্মিনালে। সম্প্রতি জি-টু-জি ও পিপিপি কাঠামোর আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে ১৫ বছরের জন্য এর আধুনিকায়ন ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার খসড়া চুক্তি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থেও (জিসিবি) অপারেটর হতে আগ্রহ দেখিয়েছে সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠান আরএসজিটিআই। এ সংক্রান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যেই চিঠি পাঠিয়েছে। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বন্দরের প্রায় সবকটি বড় টার্মিনালই কোনো না কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কেন বিদেশি অপারেটর চাইছে সরকার?
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, সরকার কেন বারবার বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দিকেই ঝুঁকছে? নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দর সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের মূল যুক্তি হলো—দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন।
সরকারের মতে, বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক অপারেটররা এলে বন্দরে যুক্ত হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অটোমেশন। বর্তমানে যেখানে জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাসে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে, সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড বা আরএসজিটিআই-এর মতো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করলে বন্দরের ‘টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম’ বা জাহাজ অপেক্ষার সময় অনেকটাই কমে আসবে। এর ফলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের ফলে রাষ্ট্র বড় অঙ্কের কনসেশন ফি ও রাজস্ব পাবে বলেও সরকারের ধারণা।
দেশি বনাম বিদেশি: দর কষাকষির মূল হিসাব
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের সবচেয়ে বড় জায়গাটি হলো আর্থিক হিসাব ও অন্যান্য দেশের প্রস্তাব। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বিরোধিতাকারীরা বলছেন, এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে দেশীয় ও বহুজাতিক কিছু প্রতিষ্ঠান আরও বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল।
এই যেমন—দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড কনসেশন ফি হিসেবে ২ কোটি ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। অন্যদিকে, দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ ২ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দেয় এবং প্রতি কনটেইনারে ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ে অন্তত ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
আবার দেশীয় তিন প্রতিষ্ঠানের জোট ‘সাইফ-কসমস-এভারেস্ট পোর্ট সার্ভিসেস’ ইজারা না চেয়ে শুধু পরিচালনার ভার চেয়েছিল এবং কনটেইনারপ্রতি ৯২ ডলার রাজস্ব দেওয়ার কথা জানায়। সংগ্রাম পরিষদের দাবি—বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) সফলভাবে এনসিটি পরিচালনা করছে এবং বন্দরের নিট আয় অত্যন্ত ভালো। এই অবস্থায় দীর্ঘ মেয়াদে বিদেশি রাষ্ট্রায়ত্ত বা বহুজাতিক কোম্পানির হাতে টার্মিনাল ছেড়ে দিলে বাংলাদেশ বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং অর্জিত মুনাফা দেশের বাইরে চলে যাবে।
শ্রমিক আন্দোলন ও জাতীয় নিরাপত্তা
বন্দরের সব টার্মিনালে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকেই উত্তপ্ত চট্টগ্রাম বন্দর। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা কমিটি, স্কপ ও জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিকভাবে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মসূচি পালন করছে।
শ্রমিক নেতাদের উৎকণ্ঠা মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে। প্রথমত, বিদেশি অপারেটর প্রতিষ্ঠান অটোমেশন নিয়ে এলে স্থানীয় অনেক শ্রমিকের চাকরি চলে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, একটি দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের শতভাগ বিদেশি নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি শ্রমিক নেতারা দাবি করছেন, এই ধরনের স্পর্শকাতর চুক্তির আগে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বচ্ছ আর্থিক ও কারিগরি মূল্যায়ন জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিত ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে শ্রমিক নেতারা ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, সরকার আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে বৈঠকে না বসে একতরফা চুক্তি স্বাক্ষর করলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে শুরু করে কুতুবদিয়ার বহির্নোঙর পর্যন্ত পুরো বন্দরের কার্যক্রম অচল করে দেওয়া হবে।
আগামী দিনের পথ কী?
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দ্রুতগতির সাথে তাল মেলাতে হলে চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বাড়াতেই হবে- এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই উন্নয়ন যাতে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, শ্রমিকদের স্বার্থ এবং জাতীয় রাজস্বকে ঝুঁকির মুখে না ফেলে—সেটি নিশ্চিত করাই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের সাথে আলোচনার টেবিলে বসে সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করবে, নাকি বিদেশি অপারেটরদের হাতেই তুলে দেওয়া হবে দেশের এই মূল চালিকাশক্তি? আপনার কী মনে হয়—চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগ কি উন্নয়নের নতুন দুয়ার খুলে দেবে, নাকি স্থানীয় ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করার পথেও হাঁটতে পারত সরকার?