টিআরপি কি শুধুই টাকার খেলা, বিজ্ঞাপন পাওয়ার কারসাজি?

টেলিভিশনের পর্দায় যে চ্যানেলগুলো সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে পরিচিত, সেগুলো কি আসলেই এতটা জনপ্রিয়? নাকি পর্দার আড়ালে চলে অন্য কোনো খেলা, থাকে অন্য কোনো হিসাব? আমরা জানি, একটি টিভি চ্যানেল কতজন দর্শক দেখছেন তার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় চ্যানেলের টিআরপি বা 'টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট'। 

আর এই একটিমাত্র সংখ্যার ওপর ভর করেই ভাগ হয় বিজ্ঞাপনের শত শত কোটি টাকা। কিন্তু টিআরপির এই পুরো হিসাবটাই যদি হয় কারসাজি আর কারচুপিতে ভরা? দর্শকের পছন্দের বদলে যদি টাকার খেলায় ঠিক হয় টিআরপি, তাহলে কার লাভ, আর কার সর্বনাশ? চলুন টিআরপি'র নেপথ্যে কী আছে, সে আলোচনাতেই যাওয়া যাক।

টিআরপি আসলে কী? 

টিআরপি'র পূর্ণরূপ হলো টেলিভিশন রেটিং পয়েন্ট। এটি একটি পরিসংখ্যান বা সূচক, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট একটি টিভি চ্যানেল বা একটি অনুষ্ঠান কতজন দর্শক দেখছেন তা পরিমাপ করা হয়। টিআরপি নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট কিছু দর্শকের টিভি সেটে বিশেষ ডিভাইস (যেমন- পিপল মিটার বা পিকচার ম্যাচিং টেকনিক) যুক্ত করে কোন সময়ে কোন চ্যানেল বা অনুষ্ঠান দেখা হচ্ছে তা রেকর্ড করা হয়। 

আর এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয় কোন সিরিয়াল, রিয়েলিটি শো বা নিউজ চ্যানেল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। বিজ্ঞাপনদাতারা এই রেটিং দেখেই ঠিক করেন তারা কোন জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রচার করবেন, কারণ টিআরপি বেশি মানেই সেখানে দর্শকের উপস্থিতিও বেশি।

বাংলাদেশে টিআরপি’তে বিএসসিএল-এর আগমন

একসময় বাংলাদেশে বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টিআরপি রেটিং জরিপ করত। তবে তাদের পদ্ধতি নিয়ে টিভি চ্যানেলগুলোর আপত্তি ও বিতর্কের শেষ ছিল না। সেই বিতর্কের অবসান ঘটাতে ও স্বচ্ছতা আনতে এগিয়ে আসে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড বা বিএসসিএল। ২০২৪ সালের এপ্রিলে তারা বাণিজ্যিকভাবে টিআরপি সেবা দেওয়া শুরু করে। আশা করা হয়েছিল, এবার হয়তো সঠিক হিসাব পাওয়া যাবে। কিন্তু সেবা চালুর পর থেকেই উঠতে থাকে গুরুতর সব অভিযোগ।

ভৌতিক টিআরপি' ও ডিভাইসের ঘাটতি

কথা ছিল, পুরো দেশের দর্শকচিত্র নির্ভুলভাবে বুঝতে দেশজুড়ে হাজার হাজার 'পিপল মিটার' বা স্পেশাল ডিভাইস বসানো হবে। তবে এ নিয়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের অনুসন্ধানে উঠে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। কথা ছিল, শুরুতে অন্তত ২ হাজার এবং ৬ মাসের মধ্যে ৮ হাজার ডিভাইস বসানো হবে। অথচ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গিয়ে দেখা যায়, ডিভাইস বসেছে মাত্র ২০০টি। আর ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় মাত্র ৩০০-তে।

একটু ভেবে দেখুন, কোটি কোটি দর্শকের দেশে মাত্র ৩০০টি ডিভাইসের ওপর ভিত্তি করে পুরো দেশের মানুষের পছন্দ-অপছন্দ কি হিসাব করা কি সম্ভব? ঠিক এই কারণেই গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন এই পুরো ব্যবস্থাটিকে 'ভৌতিক টিআরপি' বলে আখ্যা দিয়েছে। 

সম্প্রচার বন্ধ, তবুও হাই রেটিং!

তবে অসঙ্গতি কেবল ডিভাইসের সংখ্যাতেই আটকে নেই। ২০২৪ সালের ৫ ও ৬ আগস্ট ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার সাময়িকভাবে পুরোপুরি বন্ধ বা ব্ল্যাকআউট ছিল। কিন্তু সেসময় আশ্চর্যজনকভাবে বিএসসিএল-এর টিআরপি রিপোর্টে সেই বন্ধ থাকা চ্যানেলগুলোর জন্যই দেখানো হয় রেকর্ড সংখ্যক দর্শক। টেলিভিশনই যেখানে বন্ধ, সেখানে দর্শক এলো কোথা থেকে? এই কাল্পনিক ডেটা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন 'অ্যাটকো'।

টাকার বিনিময়ে রেটিং ও কোটি টাকার খেলা

এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এই ভুল রেটিংয়ে কার কী লাভ? সোজা হিসাব—যে চ্যানেলের টিআরপি রেটিং যত বেশি দেখানো যাবে, সেই চ্যানেল বিজ্ঞাপনের দর তত বাড়িয়ে দিতে পারবে। অভিযোগ উঠেছে, টাকার বিনিময়ে কৃত্রিমভাবে রেটিং ওঠানামা করানো যায়। অর্থাৎ, স্রেফ একটি সংখ্যা বদলে দিলেই বিজ্ঞাপনের বাজার থেকে হাতিয়ে নেওয়া যায় কোটি কোটি টাকা। বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই টিআরপি'তে এই কারসাজি। 

সমাধানের পথ কী?

টেলিভিশন শিল্পের অস্তিত্ব রক্ষায় এবং বিজ্ঞাপনের বাজারে আস্থা ফেরাতে চ্যানেল মালিকরা এখন স্পষ্ট কিছু দাবি তুলেছেন। ২০২৫ সালে টিভি মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো'র তরফ থেকে দাবি করা হয়, অস্পষ্ট ব্যবস্থার বদলে আন্তর্জাতিক মানের কোনো স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সংস্থাকে দিয়ে নিরপেক্ষ জরিপ করাতে হবে। একই সাথে পর্যাপ্ত ডিভাইস স্থাপন, কোনো থার্ড পার্টির মাধ্যমে তথ্য যাচাই এবং জালিয়াতিতে জড়িতদের কঠিন জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

দর্শকরা টিভির সামনে বসে কী দেখছেন, কতটা দেখছেন, আর বিশেষ করে কোন চ্যানেলে দেখছেন, তা জানার অধিকার সবার আছে। কিন্তু তথ্যের নামে কারচুপি-কারসাজির মাধ্যমে তৈরি কোনো কাল্পনিক হিসাব পুরো গণমাধ্যম শিল্পের জন্যই হুমকিস্বরূপ। এই টিআরপি সিন্ডিকেটকে রুখতে হলে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তবেই গণমাধ্যম শিল্পে আস্থা ফিরে আসবে।