টানা ভারী বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে আবারও ফুলেফেঁপে উঠেছে তিস্তা নদী। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। সোমবার রাত ৮টায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমা (৫২.১৫ মিটার) অতিক্রম করে ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে (৫২.২৫ মিটার) প্রবাহিত হচ্ছিল। একই সময়ে লালমনিরহাটে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এর আগে সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং দুপুর ৩টায় বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তিস্তা ডালিয়া ডিভিশনের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী জানান, দুপুর ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় তিস্তার পানি ৮ সেন্টিমিটার এবং সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত আরও ৭ সেন্টিমিটার বেড়েছে। আগাম পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী ২৪ ঘণ্টায় নদীর পানি বিপৎসীমার প্রায় ২০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
তিস্তার পানি বাড়তে শুরু করায় নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার পূর্ব ছাতনাই, খগাখড়িবাড়ী, টেপাখড়িবাড়ী, খালিশা চাপানী, ঝুনাগাছ চাপানী ও গয়াবাড়ী এবং জলঢাকা উপজেলার গোলমুন্ডা, ডাউয়াবাড়ী ও শৌলমারী ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে। গত দুই মাসে এটি পঞ্চমবারের মতো তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা। ফলে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
এদিকে উজান থেকে নেমে আসা তিস্তার পানি ঘোলা হয়ে গেছে। পানির সঙ্গে ভেসে আসছে গাছের ডালপালা, কাঠ ও কচুরিপানা।
পাউবোর পানি পরিমাপক নুরুল ইসলাম জানান, সোমবার রাত ৮টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এদিন সকাল ৬টা ও ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ৫২.০০ মিটার, দুপুর ১২টায় ৫২.০৫ মিটার এবং বিকেল ৩টায় ৫২.১০ মিটার, যা তখনও বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। পরে মাত্র তিন ঘণ্টায় পানি ৮ সেন্টিমিটার বেড়ে সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমা অতিক্রম করে।
তিনি আরও জানান, সোমবার বিকেলে রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও মধ্যরাতে সেখানেও বিপৎসীমা অতিক্রম করার আশঙ্কা রয়েছে।
নুরুল ইসলাম জানান, রোববার রাত ৯টায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার নিচে ছিল। এরপর সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা ২৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে কোথাও কোথাও বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে গাইবান্ধায় তিস্তা এবং কুড়িগ্রামে ধরলা নদী সতর্কসীমার কাছাকাছি প্রবাহিত হতে পারে।
নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, ‘পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত রাখতে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে রাখা হয়েছে। তবে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় রাতে আরও বাড়তে পারে। এর প্রভাব লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলার বন্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।’
চরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানান, তিস্তার পানি ইতোমধ্যে নিম্নাঞ্চলে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। উজান থেকে নেমে আসা ঘোলা পানির সঙ্গে প্রচুর গাছের ডাল, কাঠ ও কচুরিপানাও ভেসে আসছে।
চলতি বর্ষা মৌসুমে এবার নিয়ে পঞ্চমবারের মতো তিস্তার পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা ওপরে উঠেছে। এর আগে ২৩ জুন প্রথমবার বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার, ২৮ জুন দ্বিতীয় দফায় ১২ সেন্টিমিটার এবং ৯ জুলাই তৃতীয় দফায় ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে তিস্তার পানি প্রবাহিত হয়েছিল।
এদিকে লালমনিরহাটে সোমবার সকালে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে তা বেড়ে বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে। ইতোমধ্যে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়ি ও আবাদি জমিতে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তবে মাঠে উল্লেখযোগ্য মৌসুমি ফসল না থাকায় কৃষকদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা আপাতত কম।
আদিতমারী উপজেলার চর গোবর্ধন এলাকার বাসিন্দা মতি মিয়া বলেন, ‘সকালে পানি না থাকলেও বিকেলে দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে। শুনছি ভারত পানি ছেড়েছে। পানি এভাবে বাড়তে থাকলে চরাঞ্চলের ধানের চারা, বাদাম ও মিষ্টিকুমড়াসহ বিভিন্ন ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হবে।’
হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী এলাকার কৃষক ফজলু মিয়া বলেন, ‘অতিবৃষ্টিতে তিস্তা নদী পানিতে ভরে গেছে। ভারত আরও পানি ছাড়লে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।’
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, ‘ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলের কারণেই তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। শনিবার পর্যন্ত তিস্তার পানি বিপৎসীমার ২৫ সেন্টিমিটার নিচে থাকলেও সোমবার সন্ধ্যায় তা বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘যেকোনো ধরনের বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।’