চট্টগ্রামে এক বছরে ৪০ খুন, বেশিরভাগ রাজনৈতিক

গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে চট্টগ্রামে প্রায় ৪০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার অধিকাংশই রাজনৈতিক। খুনের শিকারদের মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থক ছাড়াও আছেন জামায়াত ও বিএনপির কর্মীরা। তবে এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বেশিরভাগই বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষজনিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব হত্যাকাণ্ড আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।

গত ৭ অক্টোবর দিনদুপুরে ফিল্মি কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয় রাউজানের এক ব্যবসায়ী ও বিএনপি কর্মীকে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২৮ আগস্ট রাউজানে পিটিয়ে হত্যা করা হয় স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা আবদুল মান্নানকে। এরপর থেকে রাউজানে সংঘটিত ১৭টি খুনের মধ্যে ১৩টি রাজনৈতিক কারণে হয়েছে। এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অধিকাংশই বিএনপির দুই পক্ষের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে।

গত ১ সেপ্টেম্বর সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর বাগানবাড়ি থেকে মো. ইউসুফ মিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ১১ নভেম্বর নিখোঁজের তিন দিন পর রক্তাক্ত অবস্থায় হাফেজ মাওলানা আবু তাহের নামে এক মাদরাসা শিক্ষকের লাশ উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি উপজেলার নোয়াপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন নগরীর খাতুনগঞ্জের আড়তদার মো. জাহাঙ্গীর আলম।

১৯ ফেব্রুয়ারি যুবলীগ কর্মী মুহাম্মদ হাসানকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে মুখোশধারী সন্ত্রাসীরা। ১৫ মার্চ ইফতার মাহফিল নিয়ে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় ছুরিকাঘাতে খুন হন যুবদল কর্মী কমর উদ্দিন জিতু। ২১ মার্চ পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হোয়ারাপাড়া এলাকার মোবারক খালের পূর্ব পাশে খোলা জায়গা থেকে মো. রুবেল নামে এক তরুণের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।

১৯ এপ্রিল রাতে খুন হন যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ। ১৫ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী এসে ভাত খাওয়ার সময় তার মুখে বন্দুকের নল ঢুকিয়ে হত্যা করে। ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলা সদরের কাছে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিপাড়া গ্রামে খুন হন যুবদল কর্মী ইব্রাহিম।

রাউজানের মতো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ফটিকছড়ি, সীতাকুণ্ড, সাতকানিয়া ও হাটহাজারীতেও। সাতকানিয়ায় জামায়াত কর্মীদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং হাটহাজারীতে ছাত্রদল সভাপতিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হওয়া এসব হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে থাকলেও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রাসেল বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্ব এগিয়ে এলে অপরাধীদের শনাক্ত ও ধরতে আমাদের কাজ আরও সহজ হবে।’

নগরীতেও সংঘটিত হয়েছে ৫টি রাজনৈতিক হত্যা। গত বছরের ২৮ অক্টোবর নগরীর ডবলমুরিং থানা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে খুন হন বাস্তুহারা ইউনিট কমিটি বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নূর আলম। ১০ অক্টোবর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকার বার্মা কলোনি ও শান্তিনগর কলোনিতে মো. সবুজ ও মো. শাহ আলমের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হন বিএনপি কর্মী মো. ইমন। একাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে এক্সেস রোড এলাকাতেও।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তিনি আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু পুলিশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।

অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজ পারভেজ বলেন, ‘এসব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড আগামী নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে। অনেকে ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে চাইবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দলের সিনিয়র নেতারা যদি সংগঠনে শৃঙ্খলা আনেন, বিশেষ করে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সতর্ক করেন, তাহলে এসব খুন কমতে পারে। অধিকাংশ ঘটনায় মামলা হলেও মূল আসামি বা অস্ত্রধারীদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।’