স্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলা অবস্থায় সৌদিতে বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা, জানাল পরিবার

ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা কামরুল হোসেন বাবা। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

সৌদি আরবে কামরুল হোসেন (৩৭) নামের এক বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা হয়েছে। গতকাল রোববার সৌদি আরবে এই ঘটনা ঘটে। তিনি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খোরশেদ আলমের ছেলে।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, রোববার সকালে বাড়িতে স্ত্রী হালিমা বেগম স্বপ্নার সঙ্গে ফোনকলে কথা বলছিলেন কামরুল। এ সময় হঠাৎ গুলির শব্দ এবং তার আত্মচিৎকার শোনা যায়। এরপর কামরুলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

পরে জানা যায়, সৌদি সময় রোববার ভোর ৪টার দিকে কামরুল তার কর্মস্থল তায়েফ শহরে একটি সুপার মার্কেটে কাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন। হঠাৎ এক সৌদি তরুণ তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তাৎক্ষণিক তিনি দৌঁড়ে মার্কেটের ভেতরে ঢুকে পড়েন। এ সময় সেখানে কর্মরত আরও দুই কর্মী আতঙ্কে পালিয়ে যান। পরে ওই হামলাকারী মার্কেটের ভেতরে ঢুকে কামরুলকে পরপর তিন রাউন্ড গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর হামলাকারী নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন।

কামরুলের ছোট ভাই মোজাম্মেল হোসেন মোহন জানান, তারা চার ভাই, এক বোন। মেজো ভাই আনোয়ার হোসেন ২০১৭ সালে সৌদি আরব যান। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় তিনি রিয়াদে একটি সোফা কারখানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজ করতেন। ২০২৪ সালে কারখানায় আগুন লাগলে আনোয়ার অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যান। কাগজপত্র না থাকায় এবং টাকায় অভাবে তার মরদেহ দেশে আনা যায়নি। 

কামরুল হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

আনোয়ারের মৃত্যুর তিন মাস আগে কামরুলও সৌদি আরব যান। দুই ভাই বিদেশ যাওয়ার সময় দেশে অনেক ঋণ করে যান। বাড়িতে তাদের থাকার ঘরটির জরাজীর্ণ অবস্থা। আনোয়ারের স্বপ্ন ছিল বাড়িতে একটি নতুন ঘর করার।

আগামী শুক্রবার ছোট বোনের বিয়ে অনুষ্ঠানের বিষয়ে মা জাহানারা বেগমের সঙ্গে শেষ কথা হয় কামরুলের।

জাহানারা বেগম বলেন, বোনের বিয়েতে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই দাওয়াত দিয়ে ধুমধাম অনুষ্ঠান করতে বলেছিল কামরুল।

ভগ্নিপতি সৌদি প্রবাসী একরামুল হক রনি জানান, চার বছর আগে তাদের বিয়ে হয়েছিল। শুক্রবার অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। এজন্য গত সপ্তাহে দেশে আসেন তিনি। এরপর সৌদিতে কামারুলের সঙ্গে একই এলাকায় কাজ করতেন তিনি। 

কামরুরের স্ত্রী হালিমা বেগম স্বপ্না স্বামীর সঙ্গে কথা বলা অবস্থায় গুলির শব্দ এবং তার আত্মচিৎকারের পর ফোন কেটে যাওয়ার কথা জানান শ্বাশুড়িকে। এরপর সৌদিতে অন্য সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে কারুলের মৃত্যু খবর নিশ্চিত করেন একরামুল।

পরপর দুই ছেলের এমন করুন মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না কামরুলের বাবা-মা। বিদেশ যাওয়ার সময় ছেলের ঋণের টাকা পরিশোধ, তার রেখে যাওয়া দুই শিশু সন্তানের লালন পালন এবং কীভাবে সংসার চলবে সে চিন্তায় দিশেহারা তারা। ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে আনার জন্য সরকারের আকুতি জানিয়েছে তারা।

অসহায় পরিবারটির দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ।

নিহত কামরুল হোসেন দুই ছেলে সন্তানের জনক। ছোট ছেলের বয়স তিন বছর এবং বড় ছেলের বয়স পাঁচ বছর। তার বাবা খোরশেদ আলম একজন প্রান্তিক কৃষক।

কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ ওয়ার্ড মেম্বার জাফর উল্যাহ বলেন, কামরুলের আকস্মিক মৃত্যুতে তার পুরো পরিবার এবং এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এর আগেও সৌদিতে তাদের আরো একটি ছেলে আগুণে পুড়ে মারা যায়।

৩ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার নসির উদ্দিন বলেন, ‘কী কারণে ওই সৌদি তরুণ কামরুলকে গুলি করে হত্যা করেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে, এমন মৃত্যুর খবরে আমরা সবাই শোকাহত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানে কাছে অনুরোধ তিনি যেন অসহায় পরিবারটি দিকে তাঁর সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।’