অবৈধ পথে ইতালিযাত্রা: ১০ মাস ধরে নিখোঁজ মাদারীপুরের সাগর

অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়া থেকে নিখোঁজ হয়েছেন মাদারীপুরের তরুণ মো. সাগর মিয়া। গত ১০ মাস ধরে তার কোনো সন্ধান পাচ্ছে না পরিবার। এর আগে লিবিয়ার একটি বন্দিশালা থেকে সাগরকে মুক্ত করতে তার পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৯ লাখ টাকা। নিখোঁজ তরুণের সন্ধান এবং দালালদের বিচার দাবি করেছেন তার স্বজনেরা।

সাগর মাদারীপুর সদর উপজেলার খোঁয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার কৃষক খবির মোল্লার ছেলে। তিনি গত বছরের ১৩ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। ছেলের সন্ধান চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন তার মা বেলাতুননেছা। একই সঙ্গে দালালদের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেছেন তিনি।

শনিবার বিকেলে নিজ বাড়িতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ছেলের সন্ধান চেয়ে আকুতি জানান বেলাতুননেছা।

নিখোঁজ সাগরের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সাগর। পরে মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর প্রলোভনে পড়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পরে ২৩ লাখ টাকায় সাগরকে সরাসরি ইতালি পৌঁছে দেওয়ার চুক্তি করে দালাল চক্রটি।

চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর তিন ভাগের এক ভাগ টাকা পরিশোধ করে সাগরের পরিবার। টাকা নেওয়ার পরদিন ৩ নভেম্বর সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখানে দুই দিন রাখার পর মিসর হয়ে তাকে লিবিয়ায় নেওয়া হয়। পরে বাংলাদেশি দালাল চক্র তাকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়।

পরিবারের দাবি, লিবিয়া হয়ে সাগরকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে দালাল চক্রটি তাদের কাছ থেকে চুক্তির ২৩ লাখ টাকা নেয়। ১৫ নভেম্বর রাতে লিবিয়ার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে সাগরকে একটি নৌকায় তুলে দেওয়া হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর নৌকাটি লিবিয়ার একটি সন্ত্রাসী চক্রের হাতে আটক হয়েছে বলে পরিবারকে জানায় দালালরা।

আটক সাগরকে মুক্ত করতে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেওয়ায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয় বলে পরিবারের দাবি। পরে বাংলাদেশি আরেক দালাল গোলাম মওলার মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য ৯ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। টাকা নেওয়ার পর থেকে সাগরের কোনো সন্ধান দিতে পারছে না দালাল চক্রটি।

সাগরের সন্ধান চেয়ে দালালদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও গত ১০ মাসে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানান তার স্বজনেরা। পরে বাধ্য হয়ে সাগরের মা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে সন্তানের সন্ধান চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। একই সঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি দালালদের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বেলাতুননেছা বলেন, ‘বেঁচে থাকলে ছেলে তো যোগাযোগ করত। ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে দালালরা ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিয়েছে। দালালরা শুধু আশ্বাস দিচ্ছে। তারা এখনো বলছে না আমার ছেলে নেই? আমার ছেলে আর নেই—এটা বুঝতে পারছি। আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি।’

দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করে উল্টো হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন বেলাতুননেছা। তিনি বলেন, ‘মামলা করেছি, কিন্তু চালাতে পারছি না। মামলা তুলে নিতে দালালরা হুমকি দিচ্ছে। আমি বিচার চাই, ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলের সঙ্গে তারা কী করেছে, সেটা জানতে চাই। আমার সোনার টুকরা বাবার সন্ধান চাই। ও-ই আমার ভরসা।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাগরের সহপাঠী নাসির ইসলাম বলেন, ‘সাগররা দুই ভাই, এক বোন। ভাইদের মধ্যে সাগর বড়। পরিবারটি সাগরকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। ভিটেবাড়িটুকুও বন্ধক রাখা হয়েছে। তবুও যদি তার সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে কষ্টটা কিছুটা কমত। যারা সাগরকে প্রলোভন দেখিয়ে ইতালি নেওয়ার কথা বলে লিবিয়ায় নিয়ে গেছে এবং মুক্তিপণের জন্য টাকা নিয়েছে, সেই দালালদের বিচার চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারী হলেও তিনি মূলত শিবচর উপজেলার মির্জারচর সিপাইকান্দি এলাকার ইসমাইল ব্যাপারীর ছেলে গোলাম মওলার হয়ে কাজ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গোলাম মওলা মানবপাচার চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার অধীনে শিবচরসহ পুরো জেলায় অন্তত ১০ জন সহযোগী রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সহযোগী টাকা সংগ্রহের পাশাপাশি গ্রামের মানুষকে নানা প্রলোভন দেখানোর কাজ করেন বলে অভিযোগ।

গোলাম মওলা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও চক্রের সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে গোলাম মওলার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে নামজুল ব্যাপারী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি কোনো দালালি করি না। এগুলো আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ।’

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানবপাচার রোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো আসামিকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। অনেক মামলার আসামি দীর্ঘদিন ধরে দেশছাড়া। সাগরের মা তার সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলা আদালতে করেছেন, সেটি সদর থানা-পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় একজন আসামিকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’