এক্সপ্রেসওয়েতে মরদেহ

মেয়ের বিয়ের জন্য জমি বিক্রির টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন ইসমাইল

রাজধানীর বনানীতে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করেছে পুলিশ। নিহতের নাম ইসমাইল হোসেন (৫০)। মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করতে জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তবে সেই উদ্দেশ্যে আর বাড়ি ফেরা হয়নি তার।

বনানী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) নজরুল ইসলাম তালুকদার জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৯টার দিকে বনানী এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে ওই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় তার আঙুলের ছাপ জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডারের সঙ্গে মিলিয়ে পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।

পুলিশ জানায়, নিহত ইসমাইল হোসেন জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। তিনি গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় বসবাস করতেন। মরদেহ উদ্ধারের সময় তার পরনে সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকদের ইউনিফর্মের মতো নীল রঙের শার্ট ও লুঙ্গি ছিল।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ইসমাইলকে শ্বাসরোধে হত্যার পর কোনো একটি গাড়ি থেকে তার মরদেহ ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে বনানী থানা পুলিশ এক্সপ্রেসওয়ের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। ইতোমধ্যে সন্দেহভাজন কয়েকটি গাড়ি শনাক্ত করা হয়েছে। এসব গাড়ি আটক করা সম্ভব হলে হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।

মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

নিহতের ছেলে হাসান জানান, ছোট বোন শারমিনের বিয়ের কথাবার্তা চূড়ান্ত করতেই বাবা জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার কথা ছিল। এজন্য তিনি বিয়ের খরচের টাকা সঙ্গে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

হাসান জানান, গত ৪ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৩টার দিকে জামালপুরের বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন তার বাবা। এর আগে রাত আনুমানিক ১১টার দিকে ফোন করে জানিয়েছিলেন, সকালে ঢাকায় পৌঁছাবেন। প্রথমে তার জিরানীতে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সকালে সেখানে গিয়ে বাবাকে ফোন করলে মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

তিনি আরও জানান, বোনের বিয়ের জন্য ইসমাইল ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছিলেন। এর মধ্যে আগের ২ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ করেন। কিছু টাকা দিয়ে গ্রামে একটি ঘর তৈরি করেন। বাকি প্রায় ৫ লাখ টাকা নগদ সঙ্গে নিয়ে এবং কিছু বাজার করার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসছিলেন। তার সঙ্গে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোনও ছিল। তবে মরদেহ উদ্ধারের পর এসবের কোনোটি পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

হাসান আরও জানান, পরে বনানী থানা থেকে জামালপুরের গ্রামের বাড়ির পুলিশ ফাঁড়িতে বিষয়টি জানানো হয়। সেখান থেকেই তারা বাবার নিখোঁজ হওয়া এবং পরে মরদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পারেন।

স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসমাইল হোসেন ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে চাকরি করতেন। প্রায় নয় মাস আগে অসুস্থতার কারণে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। এরপর প্রায় পাঁচ মাস গাজীপুরের কাশিমপুরে স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে বসবাস করেন। প্রায় চার মাস আগে তিনি গ্রামের বাড়ি জামালপুরে ফিরে যান। সেখানে তার মা ও বড় বোন থাকেন।

মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে জমি বিক্রি করে পাওয়া টাকা সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন ইসমাইল। কিন্তু বিয়ের দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার আগেই রহস্যজনকভাবে প্রাণ হারান তিনি। তার মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।