বাবাকে শেষ বিদায় জানিয়ে মঙ্গলবার বিকেলে সম্পন্ন হয়েছে দাফন। শোকের ভারে ন্যুব্জ পরিবারকে সময় দেওয়ারও সুযোগ মেলেনি। রাত নামতেই হাতে বই নিয়ে ছুটতে হয়েছে এটিএম বুথে রাতের ডিউটিতে। কারণ আজ বুধবার সকালে বসতে হবে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষায়। একদিকে বাবাকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন বুনে চলেছে বাগেরহাট শহরের মুণিগঞ্জ এলাকার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ইসমাইল ইকন।
বাগেরহাট শহরের মুনিগঞ্জ মেডিকেল স্কুল রোড এলাকার বাসিন্দা সদ্য প্রয়াত ইসরাফিল দাড়িয়ার ছোট ছেলে ইকন। বাবাকে হারানোর গভীর শোক বুকে নিয়েই তাকে এখন সামলাতে হচ্ছে চাকরি এবং শিক্ষাজীবনের কঠিন লড়াই।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার ভোরে অসুস্থ হয়ে পড়েন ৪৫ বছর বয়সী ইসরাফিল দাড়িয়া। সকাল ৬টার দিকে তাকে বাগেরহাট ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী এবং দুই ছেলে—ইমন ও ইকনকে রেখে গেছেন। এরমধ্যে ইসমাইল ইকন ছোট।
ইসরাফিল মোটরসাইকেল চালিয়ে সংসার চালাতেন। জোহরের নামাজের পর মুনিগঞ্জ দোতলা জামে মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে মরদেহ গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তার মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
ইকন চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তিনি বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের খরচ চালাতে বাগেরহাট শহরের রেলরোড এলাকায় কৃষি ব্যাংকের একটি এটিএম বুথে চাকরি করেন।
বাবার দাফন শেষে মঙ্গলবার রাতেই তিনি কর্মস্থলে ফিরে যান। রাত ১০টার দিকেও তাকে এটিএম বুথে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। চোখে বাবাকে হারানোর অশ্রু, হৃদয়ে গভীর শোক—তবু থেমে থাকেননি তিনি। কারণ পরদিন, ২৩ জুলাই, তার এইচএসসি পরীক্ষার ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ের পরীক্ষা।
ইসমাইল ইকন বলেন, ‘আমি পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা করতে পড়ালেখার পাশাপাশি কৃষি ব্যাংকের এটিএম বুথে চাকরি নেই। এই চাকরির বেতনের টাকা পরিবারের হাতে তুলে দেই। খানজাহান আলী ডিগ্রি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক ভর্তি হই। এবছর আমি উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ দিচ্ছি। পরীক্ষা চলা অবস্থায় আমার বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আমার বাবার গোপালগঞ্জে গ্রামের বাড়িতে দাফন শেষে ফিরে এসে আজ অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। আমি পড়ালেখা চালিয়ে যেতে চাই। পড়ালেখা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই। এজন্য সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চাইছি।’
ইকনের মামা বলেন, ‘আমার ভাগ্নে মেধাবী। ওর পড়ালেখার খুব আগ্রহ। ওর বাবার আকস্মিক মৃত্যুতে অসহায় হয়ে পড়েছে। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে ওর স্বপ্ন পূরণ হবে।’
বাগেরহাট খান জাহান আলী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ খোন্দকার আছিফ উদ্দিন রাখী বলেন, ‘ইকন আমাদের কলেজের ছাত্র। ইকনের জীবনের এই কঠিন মুহূর্ত আমাদের সবাইকে ব্যথিত করেছে। এত বড় শোকের মধ্যেও সে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি ও চাকরি চালিয়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। কলেজের পক্ষ থেকে আমরা তার পাশে আছি। প্রয়োজনে তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। আমরা তার প্রয়াত বাবার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং ইকনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’