সুন্দরবনে ফের বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য, দুই দিনে অপহৃত ২১ জেলে

সুন্দরবনে আবার নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে বনদস্যু বাহিনী। দুই দিনে পূর্ব সুন্দরবনের পৃথক এলাকায় অতর্কিত হামলা চালিয়ে অন্তত ২১ জন জেলেকে অপহরণ করেছে সশস্ত্র বনদস্যুরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি অস্ত্রসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করা সাবেক দস্যুরাই পুনরায় পুরানো পেশায় ফিরে গিয়ে সুন্দরবনে এসব অপহরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

এদিকে ঘটনার পর কোস্ট গার্ড সুন্দরবনে জোরদার তল্লাশি অভিযান শুরু করলেও এখনো পর্যন্ত কোনো জেলেকে উদ্ধার কিংবা দস্যুদের আটক করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। 

অন্যদিকে পরপর অপহরণের ঘটনায় উপকূলীয় জেলে, মহাজন ও মৎস্য ব্যবসায়ীদের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ও চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার দিবাগত রাতে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সাগরসংলগ্ন ভাঙ্গা, আমবাড়ীয়া ও নারিকেলবাড়ীয়া এলাকা এবং ঝাপসি এলাকার ভদ্রা নদী থেকে ১৫ জেলেকে অপহরণ করে নিয়ে যায় দস্যুরা। এর আগে একই সময়ে সুন্দরবনের পৃথক স্থান থেকে আরও ছয় জেলেকে ট্রলারযোগে জিম্মি করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।

অপহৃত ২১ জনের মধ্যে ১২ জন জেলের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন–খুলনার আরিফ (২৫), সগীর (৩৪), মিঠু (৩০) ও ফেরদাউস (২৮); বরগুনার পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকার ইব্রাহিম (৩৫), ইমরান (২৫), মোস্তাফিজুর (৩৫), আলামিন (২৮), হানিফ (৩৮) ও মারুফ (৪৯); এবং মোংলার উলুকাটা চিলা এলাকার মাসুদ ইজারদার (২৮) ও ইমদাদুল ইজারদার (৩০)। অপহৃত জেলেরা সবাই বন বিভাগের বৈধ অনুমতিপত্র (পাস) নিয়ে চরপাটা, পোকা জাল ও বড়শি দিয়ে সুন্দরবনের খালে মাছ ধরছিলেন।

স্থানীয় জেলে ও মহাজনদের দাবি, এই অপহরণের সাথে ‘মজনু বাহিনী’, ‘করিম-শরীফ বাহিনী’ এবং ‘বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী’র সশস্ত্র সদস্যরা সরাসরি জড়িত। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বনজীবিরা জানান, আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নিলেও তাদের অনেকেই গোপনে আবার দস্যুতায় সক্রিয় হচ্ছে। মূলত যেসকল নৌকায় দস্যুদের নির্ধারিত চাঁদা পরিশোধের ‘কার্ড’ ছিল না, তাদের লক্ষ্য করেই এই হামলা চালানো হচ্ছে।

তারা আরও জানান, নিরাপত্তা ও ব্যবসার স্বার্থে প্রতি ‘গোনে’ (জোয়ার-ভাটার সময়কাল) ৫ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে অনেক মহাজন দস্যুদের কার্ড সংগ্রহ করলেও, যাদের কার্ড ছিল না তাদের আটকে রেখে এখন মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করছে পুনর্সংগঠিত এসব দস্যুদল।

অপহরণের বিষয়টি নিশ্চিত করে দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ফরেস্ট রেঞ্জার) মিল্টন রায় জানান, বনের খালে ও সাগরে মাছ ধরার সময় অজ্ঞাতপরিচয় দস্যুরা জেলেবহরে হামলা চালিয়ে ১৫ জনকে একটি ট্রলারে তুলে নিয়ে যায়।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘ঘটনা জানার পরপরই এসআরবি, কোস্ট গার্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। অপহৃত নিরীহ জেলেদের দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।’

এদিকে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন সদর দপ্তরের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বলেন, ২১ জেলে অপহরণের খবর পাওয়ার পরপরই কোস্ট গার্ডের দুটি দল সংশ্লিষ্ট এলাকায় জোরদার তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।

সুন্দরবনে কোনো ধরনের দস্যুতা বরদাশত করা হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, জিম্মি জেলেদের উদ্ধার এবং দস্যুদের গ্রেপ্তার করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে সুন্দরবনে আত্মসমর্পণকারীদের আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়া ও দস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় জীবন-জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন উপকূলীয় মৎস্যজীবীরা। অপহৃত জেলেদের দ্রুত জীবিত উদ্ধার এবং সুন্দরবনকে পুনরায় দস্যুমুক্ত করতে কোস্ট গার্ড, বন বিভাগ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে দ্রুত কঠোর যৌথ অভিযান পরিচালনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন শরণখোলা ও মোংলা এলাকার জেলে-মহাজনরা।