জিএম কাদেরের বাড়িতে হামলা

বৈষম্যবিরোধীর ২ নেতাকে সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদ, ছুটে গেলেন সারজিস

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের রংপুরের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় মহানগর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি ও জেলা আহ্বায়ক ইমরান আহমেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী দুই নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে—এমন খবর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। তিনিও সেনা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন। 

এই সময় জিএম কাদেরের বাড়িতে মোটরসাইকেলে আগুনের ঘটনায় জড়িতদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে দেখার করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেন এনসিপির নেতারা। পরে রাত আড়াইটার দিকে সেনা সদস্যরা রংপুর সদরদপ্তরে ফিরে যান। এর আগে নগরীর পায়রা চত্বর এলাকা ঘিরে রাখেন সেনা সদস্যরা।

শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে নগরীর পায়রা চত্বরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এই খবরে রাত দেড়টার দিকে ঘটনাস্থলে যান সারজিস আলম। 

ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি জানান, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ফোনকল করে তাদের পায়রা চত্বরে ডাকা হয়। হামলার ঘটনায় জড়িতদের পরিচয় শনাক্তে তাদের ভিডিও ফুটেজ দেখিয়ে জানতে চাওয়া হয়।

সারজিস আলম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে যে কাজগুলো করেছে, একই কাজ বি-টিম হিসেবে করেছে জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের যে পরিণতি হয়েছে, একই পরিণতি জাতীয় পার্টির হওয়া উচিত। এখন দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পার্টির যে মেয়র, সেই মেয়রকে পদে বসানোর জন্য আবার মিছিল করা হয়। আমরা মনে করি, ওই মিছিলে জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীর নামে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের যারা নেতা-কর্মী তারা থাকবে।’

সারজিস বলেন, ‘আমরা মনে করি, এটা শুধুমাত্র একটা শুরু, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার একটা প্রক্রিয়া। সুতরাং এই পরিস্থিতি যখন তৈরি হয় তখন সেটা শুধু রংপুর নয়, পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বিপজ্জনক।’ 

এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, ‘যখন জিএম কাদের রংপুরে এসে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে মিটিং করতেছিলেন, আমরা মনে করি, জাতীয় পার্টির এটি এখানকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার প্রক্রিয়া, যেটা এখানকার ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলনে যারা লড়াই করেছে, তারা কখনও এটা মেনে নিতে পারে না, সেটি এনসিপি হোক, বিএনপি হোক, জামায়াত বা অন্য যেকোনো আমাদের সহযোদ্ধা হোক। সেই জায়গায় তারা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। এই বিক্ষোভে প্রথমে জিএম কাদেরের সমর্থকেরা হামলা করেছে। এগুলোর স্পষ্ট ফুটেজ আছে। সেই জায়গা থেকে পরবর্তীতে তাদেরই কেউ নিজেদের সেভ করার জন্য এই হামলা (জিএম কাদেরের বাড়িতে হামলা) করেছে কিনা, নাকি অন্য কেউ করেছে সেই বিষয়টি তদন্ত হতে পারে।’

এখনও কেন জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ হয়নি প্রশ্ন রেখে সারজিস বলেন, ‘তদন্ত হতে হলে শুরু থেকে হতে হবে। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হলো, জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধ না কেন। তারা কীভাবে রংপুরে এত বড় মিছিল করতে পারে, তাও একজন অবৈধ নির্বাচনের অবৈধ মেয়রকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য। অন্যদলের নেতা-কর্মীরা যখন তাদের জায়গা থেকে বিক্ষোভ মিছিল করে, সেই মিছিলে কারা সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে। যদি তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে হয়, প্রথমে সেটা করতে হবে। মামলা হলে প্রথমে তাদের বিরুদ্ধে করতে হবে, গ্রেপ্তার করলে প্রথমে তাদের করতে হবে।’

সারজিস বলেন, ‘তারা যদি সার্বিক দিক থেকে যত রকমের প্রভাবক, অনুঘটক দিয়ে একটা ঘটনা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করে, এরপর যদি এরকম দু-একটা বাইক পুড়ে যায়, সেটার জন্য দায়ী কখনও এদেরকে (এনসিপি বা বিএনপিকে) করা যেতে পারে না। তারপরও এই যে বিশৃঙ্খলা, এগুলো আমরা একদমই প্রত্যাশা করি না। একটা বাইক কেন, একটা পাতাও পুড়ে যাক সেটা আমরা প্রত্যাশা করি না।’ 

এদিকে, গত শুক্রবার জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের রংপুরের বাড়ি ‘দ্য স্কাই ভিউতে’ হামলার ঘটনায় পায়রা চত্বরে শনিবার রাতেই মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, সদস্যসচিব ও জেলা সদস্যসচিবকে ডাকা হয়। তাদের কাছেও জানতে চাওয়া হয় এ হামলার সঙ্গে তাদের নেতা-কর্মীরা জড়িত কি না। বিএনপি বলছে, জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বিএনপির মহানগরের আহ্বায়ক শামসুজ্জামান সামু বলেন, ‘সেনাবাহিনী আমাদেরকে এখানে ডেকেছে। তারা জানতে চেয়েছে, সেদিনের হামলার ঘটনায় কেউ জড়িত কিনা। বেশ কয়েকটি ভিডিও ফুটেজ দেখিয়েছেন তারা। এখান থেকে একজনকে শনাক্ত করেছি। এ ধরনের সন্ত্রাসী কার্যকলাপে দলের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এর আগে শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কোতয়ালি থানায় গিয়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও রংপুর সিটির সাবেক মেয়র মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফাসহ জাতীয় পার্টি ও অঙ্গ সংগঠনের ১৮ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলার আবেদন করেছেন এনসিপি নেতা আলমগীর রহমান নয়ন।

আলমগীর রহমান নয়ন বলেন, ‘রংপুরে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টির যারা দোসর ছিলেন তারা আমাদের ছাত্র ভাইদের ওপর অন্যায়ভাবে হামলা করেছে। এর মধ্যে আমাদের চারজন ভাই গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে।’

জাতীয় পার্টির লোকেরা নিজেরাই নিজেদের গাড়িতে আগুন দিয়েছে উল্লেখ করে এনসিপির এই নেতা বলেন, ‘তারা নিজেরাই নিজেদের গাড়িতে আগুন দিয়েছে। সেজন্য আমরা থানায় অভিযোগ দিয়েছি। এখন পর্যন্ত ওসি আমাদের মামলা নেয়নি। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন।’

৭২ পদাতিক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল হুমায়ুন কাইয়ুম বলেন, ‘কেউ যদি তার ব্যক্তিগত চরিতার্থ বাস্তবায়ন করতে চায়, সেটাতে যদি মানুষের অমঙ্গল হয়, তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সুন্দর চোখে দেখবে না। সুতরাং আমাদের কাজ হচ্ছে শান্তি রক্ষা করা।’

এই সেনা কর্মকর্তা বলেন, ‘কারা ওই ঘটনার সাথে জড়িত—তা শনাক্তে আমরা এখানে এসেছিলাম। আমি রংপুরের ছেলেদের সবাইকে চিনি না। আমার সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। আমাকে দুটি দলের (স্থানীয়) কর্ণধার কথা দিয়েছেন, তারা ভিডিও ক্লিপ দেখে চিহ্নিত করেছেন, তাদের দলের লোক। তারা যা বহন করছিল, তা তাদের বহন করার কথা ছিল না। রোববার তারা তাদেরকে আমাদের কাছে নিয়ে আসবে। দে উইল টেল সরি, তারা আমাদের কথা দেবেন নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তারা এমন কোনো কর্মকাণ্ড করবেন না যেটা মানুষের বা শান্তির বিরুদ্ধে যায়।’