রমেকে আইসিইউ সংকটে জীবনযুদ্ধে হার মানছেন রোগীরা, এক মাসে ২৭ মৃত্যু

উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতাল আইসিইউ সংকটে জর্জরিত। বিভাগের আট জেলার কোটি মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয় এই হাসপাতাল হলেও– এখানে গুরুতর রোগীদের জন্য রয়েছে মাত্র ১০টি আইসিইউ বেড। প্রয়োজনের তুলনায় এই সংখ্যা এতটাই কম যে, বহু রোগী আইসিইউ সাপোর্ট না পেয়ে মৃত্যুর দিকে এগি যাচ্ছেন।

সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির গভীর সংকটের নির্মম চিত্র তুলে ধরেছে। গত ১ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত ৩০ দিনে আইসিইউতে ভর্তি হওয়া ৫৮ জন রোগীর মধ্যে ২৭ জনই মারা গেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইসিইউ সাপোর্ট না পাওয়াই এই মৃত্যুহারের অন্যতম বড় কারণ। বর্তমানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আরও ১০ জন রোগী, যাদের বেশিরভাগই সংকটাপন্ন।

আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের অধিকাংশই স্ট্রোক, নিউমোনিয়া ও অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত। অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সাইফুল ইসলামের স্ত্রী আরজিনা বেগম বলেন, ‘২৪ দিন ধরে আমার স্বামী গুরুতর অসুস্থ। তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। অনেক কষ্ট করে আইসিইউতে ভর্তি করাতে পেরেছি। কিন্তু প্রতিদিনই মনে হয়, তাকে হারিয়ে ফেলব।’

অন্যদিকে আরেক রোগীর স্বজন সোনালী বেগম বলেন, ‘আইসিইউতে বেড পাওয়া এখন ভাগ্যের ব্যাপার। অনেক রোগী বেড না পেয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমরা শুধু অপেক্ষা করছি- কখন কী হয়।’

রোগীর স্বজন জয়নাল আহমেদ বলেন, সরকারি হাসপাতাল ছাড়া বাইরে প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি করা হলে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ পড়ছে। তাই সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার জন্য অপেক্ষা করছি। তবে সিরিয়াল পেতে পেতে রোগী মারা যাবে বলে মনে হচ্ছে। এজন্য অতিদ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ বেড সংখ্যা বাড়ানোর দাবি করছি।’

এক হাজার শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু এত বিশাল রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো আইসিইউ সুবিধা এখানে নেই। ফলে গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছ।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের স্বজনদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। রোগীর এক স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছয় মাস আগে আইসিইউর জন্য চেষ্টা করেও পাইনি। এখন আবার একই অবস্থা। টাকার অভাবে প্রাইভেট হাসপাতালে নিতে পারছি না। তাহলে আমরা যাব কোথায়?’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই আইসিইউর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু সীমিত বেড ও যন্ত্রপাতির কারণে অনেক রোগীকেই ভর্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে গুরুতর রোগীরা প্রয়োজনীয় লাইফ সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে আইসিইউ সেবার এমন সংকট অগ্রহণযোগ্য। শুধু বেড বাড়ানোই নয়, পাশাপাশি আধুনিক লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম, ভেন্টিলেটর, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স নিশ্চিত করা জরুরি।

বর্তমান বাস্তবতায় অনেক রোগী বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে, যেখানে খরচ বহন করা সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। ফলে দরিদ্র রোগীরা চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সচেতন মহলের মতে, দ্রুত আইসিইউ ইউনিট সম্প্রসারণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণের কোনো বিকল্প নেই।

মাত্র ৩০ দিনের ভর্তি ৫৮ জন রোগীর মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু-এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের শেষ আশ্রয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, অথচ আইসিইউ সাপোর্ট সীমাবদ্ধ মাত্র ১০টি বেডে। তাই এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও তীব্র হবে-এবং জীবন-মৃত্যুর এই লড়াইয়ে হারতে থাকবে আরও অসংখ্য মানুষ।

রমেকের ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. আলফে সানি মৌদুদ আহমেদ বলেন, ‘আইসিইউতেই যদি এত রোগী মারা যায়, তাহলে বাইরে কতজন মারা যাচ্ছে তার কোনো পরিসংখ্যান নেই। প্রতিদিনের আড়াই থেকে ৩ হাজার রোগীর অন্তত ১০ শতাংশের আইসিইউ প্রয়োজন। সেই হিসেবে এখানে কমপক্ষে ১০০টি আইসিইউ বেড থাকা প্রয়োজন।’

ডা. মো. আলফে সানি মৌদুদ আহমেদ আরও বলেন, ‘বর্তমানে মাত্র ১০টি বেড দিয়ে আমরা সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছি। পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সীমিত সম্পদ নিয়েই সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। আইসিইউ বেড বাড়ানোর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত সমাধানের আশায় আছি।’