ভারতীয় পরিচয় দেওয়ার পরও গুলি করল বিএসএফ

কুড়িগ্রামের উলিপুর সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে দুই ভারতীয় নাগরিক আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তারা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে প্রথমে কুড়িগ্রাম ও পরে রংপুরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। 

রোববার রাত ২টার দিকে তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আহত দুজন হলেন ভারতের আসামের দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলার চর মানকাচর বড়বালু গ্রামের মো. ইসমাইল ও আব্দুল আলিম। তাদের মধ্যে আব্দুল আলিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অস্ত্রোপচার করে তার পেট থেকে একটি গুলি বের করেছেন চিকিৎসকেরা।

আহতদের দাবি, গরু চরাতে গিয়ে তারা সীমান্তের কাছাকাছি চলে গেলে বিএসএফ সদস্যরা তাদের আটক করেন। পরে একটি নৌকায় তুলে মারধরের পর তাদের গুলি করা হয়। নিজেদের ভারতীয় নাগরিক পরিচয় দেওয়ার পরও বিএসএফ তাদের ওপর নির্যাতন চালায় বলে অভিযোগ করেন তারা।

হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রোববার দুপুরের দিকে উলিপুর সীমান্ত এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন ইসমাইল ও আব্দুল আলিম। পরে সীমান্তবর্তী কয়েকজন জেলের সহায়তায় তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় প্রথমে কুড়িগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে এবং পরে রংপুর নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে রাত ২টার দিকে তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আব্দুল আলিম জানান, তারা আসামের বাসিন্দা এবং কোনো অপরাধ করেননি। সীমান্তের কাছে যাওয়ার পর বিএসএফ তাদের আটক করে মারধর করে। তারা ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দেওয়ার পরও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়নি। একপর্যায়ে তাদের গুলি করা হয়।

ইসমাইলও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তার ভাষ্য, বিএসএফ তাকে জোর করে আটক করে একটি নৌকায় তোলে। সেখানে মারধর করা হয়। পরে গুলি করার পর এক জেলের সহায়তায় তারা বাংলাদেশে চলে আসেন। তবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর কীভাবে ও কোথা দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছেছেন, সে বিষয়ে তারা নিজেরাও পুরোপুরি নিশ্চিত নন বলে জানান।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. আব্দুল হাদী বলেন, ‘আমরা দুইজন ভারতীয় নাগরিককে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে পেয়েছি। তাদের গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল। আমরা তাদের ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নয়, রোগী হিসেবে চিকিৎসা দিয়েছি। আব্দুল আলিমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অস্ত্রোপচার করে তার শরীর থেকে একটি গুলি বের করা হয়েছে।’

হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান বলেন, ‘দুই গুলিবিদ্ধ ব্যক্তির চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তারা সার্জারি বিভাগের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তাদের মধ্যে আব্দুল আলিমের অবস্থা গুরুতর।’

রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রথমে ওই দুই ব্যক্তি একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেন। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দেন। পরে চিকিৎসার জন্য তাদের রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। চিকিৎসা শেষে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পুলিশ সূত্র জানায়, দুই ব্যক্তি কীভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে গরু পাচারের অভিযোগের সত্যতা আছে কি না এবং কোন পরিস্থিতিতে তারা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের ভারতীয় নাগরিকত্বের দাবিও যাচাই করা হচ্ছে।

চিকিৎসাধীন দুই ব্যক্তিকে পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া সীমান্তে গুলির ঘটনা সম্পর্কে বিজিবির কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্বশীল পর্যায়ে যোগাযোগের পর ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।