উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে লোকসান সাড়ে ৪ টাকার বেশি। গত অর্থবছরে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মোট লোকসান প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকা। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলছেন, ভর্তুকি পুরোপুরি তুলে নিতে ধাপে ধাপে দাম বাড়বে বিদ্যুতের। তবে, শুনানি এড়িয়ে দাম বাড়ানোয়, যৌক্তিক কারণ জানার অধিকার থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের গত অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের গড় উৎপাদন খরচ ৭ টাকা ৬৩ পয়সা। স্বতন্ত্র উৎপাদনকারী বা আইপিপি'র খরচ ছিলো সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ৬২ পয়সা, আর ইউনিট প্রতি সর্বনিম্ন ৬ টাকা ৮৫ পয়সা খরচ হয় পাবলিক প্লান্টে।
গত অর্থবছর প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড়ে খরচ ১১ টাকা ৩৩ পয়সা এবং যার গড় বিক্রি মূল্য ছিলো ৬ টাকা ৭০ পয়সা। ইউনিটপ্রতি লোকসান প্রায় ৪ টাকা ৬৩ পয়সা। মোট লোকসান দাঁড়ায়, ৪৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ১৭ লাখ টাকা। ভর্তুকির অর্থ জোগান দিতে সরকারকে বন্ডও ছাড়তে হচ্ছে। যা ঋণের চাপ বাড়াচ্ছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘বিদ্যুতে আমরা আস্তে আস্তে ভর্তুকি থেকে বেড়িয়ে আসব, এটা বারবার বলে আসছি। সরকারও বলছে, আমাদের বেড়িয়ে আসতে হবে। কারণ ডলারের যে ডিফারেন্স হয়েছে, ডিভ্যালু হয়েছে টাকার এতে একটা বড় ডিফারেন্স হয়ে গেছে প্রাইসিংয়ের ক্ষেত্রে। আমাদের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির প্রাইসে। এটাকে সমন্বয় করতে হবে। সরকার বলছে, তোমরা দুই বছরে করো বা তিন বছরে করো যে সময়েই করো…এটাকে নিয়ে আসতে হবে।’
ভর্তুকি থেকে সরে আসার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আবারো গড়ে বিদ্যুতের দাম ৭ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নসরুল হামিদ জানান, ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী তিনটি স্তরে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ হবে। মাসে ২০০ ইউনিটের কম ব্যবহার করলে প্রতি ইউনিটে ৩০ পয়সা বাড়বে। মাসে ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের, প্রতি ইউনিটে ৭০ থেকে ৮০ পয়সা বেশি দিতে হবে।
এতে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। রাজধানীর এক মুদি দোকানী বলেন, ‘প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বাড়ার ফলে আমাদের লাভের অংশ কমে গেছে। এরমধ্যে আবার বিদ্যুতের দাম বাড়া আমাদের জন্য জুলুম হয়ে যাবে। এই মুহুর্তে বাড়ানোটা মনে হয় ঠিক হচ্ছে না। আরেকটু ভর্তুকি দিয়ে হলেও জনগনকে একটু সাপোর্ট দেওয়া উচিত।’
গণশুনানি এড়িয়ে দাম বাড়ানোর সমালোচনা করছেন বিশ্লেষকরা। সেই সাথে অতিরিক্ত সক্ষমতা বসিয়ে রেখে ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা টানাও অযৌক্তিক বলে মত তাদের।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, ‘মূল্য ন্যায্যভাবে নির্ধারিত হচ্ছে কি হচ্ছে না এটা যাচাই করা ভোক্তার অধিকারের পর্যায়ে পরে। এই অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্র বিআরসি আইনের আওতায় গণশুনানীর ভিত্তিতে নির্ধারণ করার বিধান করেছিল। আজকে সরকার সে অধিকার কেড়ে নিয়েছে।’
দেশে বিদ্যুৎখাতে ১০ শতাংশের বেশি সিস্টেম লস আছে। গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে অপচয় হয় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা।