দাম জানতে ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা কি আসলেই বেআইনি?

প্রায় প্রতি সপ্তাহেই অনলাইন থেকে নানা পণ্য কেনাকাটা করেন নাদিয়া (ছদ্মনাম)। অনলাইনে নানা বিজ্ঞাপন দেখে বিভিন্ন পণ্য কিনে মাঝে মাঝে হতাশও হন তিনি। এর ওপর আবার আছে মূল্য জানতে চেয়ে ইনবক্সে যাওয়ার হুজ্জত।

নাদিয়া বলেন, ধরুন, ফেসবুকে কোন একটি অনলাইন শপের পণ্য আপনার পছন্দ হয়েছে। সেই পোস্টের কমেন্টে আপনি জানতে চেয়েছেন পণ্যটির দাম কতো। এরপর সেই অনলাইন শপটি দাম না জানিয়ে উত্তর দেয় ‘ইনবক্সে আসুন’। এরপর ইনবক্সে গিয়ে জানতে হয় দাম।
 
নাদিয়ার মতো এমন অভিজ্ঞতা অনেকরই রয়েছে। কেন দাম জানতে ইনবক্সে যেতে হয় এ নিয়ে রয়েছে যেমন গ্রাহকদের তরফ থেকে নানা প্রশ্ন, তেমনি বিক্রেতাদেরও রয়েছে নানা মত।
 
অনলাইনে পোশাক বিক্রি করে নীলারণ্য। নীলারণ্য পেজের ম্যানেজার সাহেদা মুন্নী ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, আমরা সাধারণত তিনটি কারণে ইনবক্সে ক্রেতাকে ডেকে থাকি। প্রথমত, আমরা পোস্ট বুস্ট করি। সেখানে দাম উল্লেখ করলে ক্রেতা পোস্টে লাইক করে চলে যাবে। আর দাম উল্লেখ না করলে ক্রেতা পেজের ইনবক্সে নক দেয়। সেক্ষেত্রে আমরা ক্রেতাকে দামের পাশাপাশি পণ্যের সঠিক বর্ণনা দিতে পারি।
 
সাহেদা মুন্নী বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, পেজের পোস্টে দাম উল্লেখ করে দিলে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্যের মান কমানোর পাশাপাশি দামও কমিয়ে বাজারে ছেড়ে দেয়। এতে করে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হই। তৃতীয়ত, পেজের ইনবক্সে ক্রেতা নক দিলে আমাদের পেজের এনগেইজমেন্ট বেড়ে যায়।’
 
নারী উদ্যোক্তাদের সংগঠন হার ই-ট্রেডের প্রেসিডেন্ট ওয়ারেছা খানম প্রীতি ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘অনেকেই পণ্যের দাম জানতে ইনবক্সে নক দিতে বলেন এটা একান্তই তাদের ব্যবসায়িকনীতি। এর পেছনে তাদের যৌক্তিক যুক্তিও আছে। তবে সবাইকে মনে রাখতে হবে, উন্মুক্ত বাজারে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে গেলে অবশ্যই সেভাবেই দাম নির্ধারণ করতে হবে যাতে করে কোন ক্রেতা প্রতারিত না হয়। আর ক্রেতারাও অনেক সচেতন, এখন তারা কেনার আগে বাজার যাচাইবাছাই করেই কেনাকাটা করেন।’ তবে প্রীতি জানান, ক্রেতাকে ইনবক্সে না ডাকার ব্যাপারে তাঁদের সংগঠনের সদস্যদের নির্দেশনা দেওয়া আছে।

সম্প্রতি নিজেদের বেসরকারি ভোক্তা অধিকার সংস্থা পরিচয় দিয়ে কনশাস কনজ্যুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নামের একটি ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে দাবি করা হচ্ছে, দাম জানতে ইনবক্সে আসার কথা বলা ভোক্তা অধিকারের লঙ্ঘন। সিসিএসের পোস্টে বলা হয়েছে, ‘ফেসবুক পেজে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কেউ পণ্যের মূল্য জানতে চাইলে ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা বেআইনি ও ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘন। ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী মূল্য দৃশ্যমান থাকতে হবে।’ জনসচেতনতায় এমন কার্ড প্রচার করা হচ্ছে বলে সিসিএসের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

call-to-inboxগত ৯ মে পোস্ট করা পোস্টটিতে এরই মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি রিঅ্যাকশন পড়েছে, কমেন্টে করেছেন ১৫৩ জন। ৩৪০ জনের বেশি পোস্টটি শেয়ার করেছেন।

তাহলে ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা কি বেআইনি?

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এ বলা হয়েছে, ‘কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধি দ্বারা আরোপিত বাধ্যবাধকতা অমান্য করিয়া তাহার দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান কোন স্থানে পণ্যের মূল্যের তালিকা লটকাইয়া প্রদর্শন না করিয়া থাকিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদণ্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।’

অর্থাৎ এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, দোকান বা প্রতিষ্ঠানের যেকোনো পণ্যের মূল্যতালিকা প্রকাশ্যে রাখতে হবে। তবে অনলাইনে বা ভার্চুয়াল মাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে ব্যবহার করে ব্যবসার ক্ষেত্রে বিক্রির ক্ষেত্রে মূল্য তালিকা প্রকাশ করার বাধ্যবাধকতা বিষয়ে কিছু বলা নেই।

একটি বিষয় স্পষ্ট যে, ভোক্তা অধিকারের আইনি ভিত্তির দোহাই দিয়েই ‘ইনবক্সে আসুন’ বলা নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। দেশে প্রচলিত ভোক্তা অধিকার আইনই এখানে নির্ধারণ করতে পারে বেআইনি বা অবৈধ হওয়ার বিষয়টি। তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এ ক্ষেত্রে স্পষ্ট করে কিছু বলছে না।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ঘুরতে থাকা এমন দাবি নিয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) এ. এইচ. এম. সফিকুজ্জামান ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘কে কী প্রচার করছে, তা তাদের ব্যাপার। ওয়েবসাইটে আইন প্রকাশ করা আছে, আপনার দরকার হলে দেখে নিন।’ এ বিষয়ে কোনো আইনি ব্যাখ্যাও তিনি দিতে চাননি।
 
এ ব্যাপারে সিসিএসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। তাঁদের পেজে দেওয়া ওয়েবসাইট ঠিকানায় ঢোকাই যায় না। কোনো ফোন নম্বরও পেজটিতে দেওয়া নেই। পাশাপাশি পেজে দেওয়া মেইল ঠিকানাতেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
 
ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলার সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডলের কাছেও জানতে চাওয়া হয়েছিল এ ব্যাপারে। তিনিও কোনো ব্যাখ্যা দেননি। মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে পারছি না। আইনের ব্যাপার, আগে আইন পড়তে হবে। আইন পড়ে বিস্তারিত জানাতে পারব।’ এটুকু বলেই ফোনের লাইন কেটে দেন তিনি।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, যখন ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন করা হয় তখন অনলাইন মাধ্যম ছিলো না। এভাবে অনলাইনের প্রসার ছিলো না। ক্রেতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভোক্তার আইনের সংশোধন আনা দরকার।