বিদায়ী বছর দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য ছিল বড় ধরনের সংস্কারের বছর। বিগত সরকারের সময় লুটপাটের শিকার পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পরিবর্তন করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে বছর শেষেও এসব ব্যাংকের সাধারণ গ্রাহকেরা তাঁদের আমানত পুরোপুরি ফেরত পাননি। পাহাড়সম খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের বিশাল চ্যালেঞ্জ এখনো ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্টদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ব্যাংক খাত। তবে গেল দেড় দশকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে নামে-বেনামে ঋণ বিতরণ এবং একশ্রেণির সুবিধাভোগীদের ব্যাংক দখলের কারণে এ খাত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। বছরের পর বছর ঋণ পুনর্নির্ধারণ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বল নজরদারির খেসারত দিচ্ছেন সাধারণ আমানতকারীরা; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সামগ্রিক অর্থনীতি। বিদায়ী বছরে কঠোর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত ও কিছু সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হলেও ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি।
দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণের ভারে নুয়ে আছে এ খাত। সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা মোট বিতরিত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের সহায়তায় বাংলাদেশ ব্যাংক একীভূতকরণ নীতিতে জোর দেয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল অকার্যকর ব্যাংকগুলোকে শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে একীভূত করে আমানতকারীদের অর্থের সুরক্ষা দেওয়া। এর অংশ হিসেবে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়। তবে গ্রাহকদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে এখনো পুরোপুরি স্বস্তি দিতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি বের করা হয়েছে। টাকা সরাসরি গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হয়ে যাবে। আমরা চাই না গ্রাহকরা ব্যাংকে এসে ভিড় বা বিশৃঙ্খলা করুক। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই আমানত সমন্বিত হবে।’
অন্যদিকে, বছরজুড়ে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লম্ফন দেখা গেছে। দেশের বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার কেনায় রিজার্ভ বর্তমানে ৩২ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকগুলোর তদারকি জোরদার করতে ‘ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ’ অনুমোদিত হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার’ অনুমোদন নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্যাংক খাতে শুধু সংস্কার নয়, প্রয়োজন এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা। অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, যা একটি ইতিবাচক দিক। সাধারণত রাজনৈতিক প্রভাবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে।’
গবেষণা সংস্থা সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘২০২৫ সাল পুরোটাই হবে ব্যাংকিং খাতের মেরামতের সময়। সত্যিকারের চিত্রটা বেরিয়ে আসা একটি ভালো শুরু। তবে এই প্রক্রিয়ার গতি ত্বরান্বিত করতে ফরেনসিক অডিটগুলো দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি ছিল।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ বছর ব্যাংক খাতে আমূল পরিবর্তন না এলেও সংস্কারের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হয়েছে। যা সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতকে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।