বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩৫ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, প্রতি মাসে গড়ে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার।
এই প্রেক্ষাপটে, সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফের সাথে নতুন একটি ঋণ কর্মসূচীতে যুক্ত হতে যাচ্ছে। নতুন এই ঋণ নিয়ে আলোচনা করতে আইএমএফের ১২ সদস্যের একটি দল বর্তমানে ঢাকা সফর করছে। আইএমএফের সাথে আগের সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি বাতিল করে নতুন এই ঋণ কর্মসূচীর অধীনে সরকার সংস্থাটির কাছে প্রায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ প্রত্যাশা করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দেশে প্রতি মাসে যখন প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সই আসে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ যখন ৩৫ বিলিয়ন ডলারের ওপরে, তখন সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেতে এত দৌড়ঝাপ কেন? এই ঋণ কি কেবলই ডলারের জোগান দেবে, নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনো তাৎপর্যপূর্ণ কারণ? মোদ্দা কথা, আইএমএফের এই ঋণ বাংলাদেশের জন্য ঠিক কতটা জরুরি? চলুন এবারে আলোচনায় যাওয়া যাক।
কেন বাতিল হলো পুরোনো চুক্তি?
আলোচনার শুরুতেই আইএমএফের পুরোনো চুক্তি কেন বাতিল হলো সেদিকে চোখ রাখা যাক। ২০২৩ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আইএমএফের সাথে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের একটি ঋণচুক্তি করেছিল, যা পরে বাড়িয়ে ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার করা হয়।
এই চুক্তির অধীনে বাংলাদেশ ৫ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে, যার শেষ দুটি কিস্তি পেয়েছে ২০২৫ সালের জুনে। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে আইএমএফ ষষ্ঠ কিস্তির টাকা আটকে দেয়, কারণ ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার তাদের দেওয়া শর্ত পূরণ করতে পারেনি।
চলতি বছরের শুরুতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এপ্রিল মাসে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকেও যোগ দেন। সেখান থেকে ফিরে অর্থমন্ত্রী জানান, ঋণ পেতে আইএমএফের সব শর্ত বাংলাদেশ মেনে নেবে না।
এবারে আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সাথে নতুন ঋণ কর্মসূচী নিয়ে আলোচনা শুরুর পর মন্ত্রী জানান, ফ্যাসিস্ট আমলের ওই ঋণ কর্মসূচি জনগণের স্বার্থ রক্ষা করেনি। তাই সেটি বাদ দিয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে। দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েই আইএমএফের সাথে নতুন ঋণচুক্তি হবে বলেও জানান তিনি।
আইএমএফ ঋণ: ডলার প্রাপ্তি নাকি বৈশ্বিক আস্থার সনদ?
এবারে আসা যাক মূল আলোচনায়। আইএমএফের ঋণ বাংলাদেশের জন্য কতটা প্রয়োজন? এই ঋণের তাৎপর্য কেবল ডলার প্রাপ্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইএমএফের ঋণ প্রাপ্তির চারটি সবচেয়ে বড় সুবিধা রয়েছে।
প্রথমত, ক্রেডিট রেটিং ও বিদেশি বিনিয়োগ। আইএমএফ কোনো দেশকে ঋণ দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, সেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ‘সবুজ সংকেত’ দেওয়া। অর্থাৎ, সেই দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিকে সার্টিফাই করা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি যেমন মুডি'স, ফিচ আইএমএফের এই সিদ্ধান্তকে 'বৈশ্বিক আস্থার সনদ' বা 'আর্থিক শৃঙ্খলার স্বীকৃতি' হিসেবে গণ্য করে। এর ফলে একটি দেশের সামগ্রিক ক্রেডিট রেটিং বাড়ে। রেটিং ভালো হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা (এফডিআই) বাংলাদেশে টাকা খাটাতে নিরাপদ বোধ করবেন এবং শেয়ার বাজার ও বন্ড মার্কেটে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে।
দ্বিতীয় সুবিধাটি হলো, বহুজাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ সহায়তা প্রাপ্তি সহজতর হওয়া। আইএমএফ হচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনীতির ‘গেটকিপার’। আইএমএফের ঋণ পেলে বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, কিংবা জাইকা'র মতো বড় বড় বহুজাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বাজেট সহায়তা বা সহজ শর্তে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পাওয়া বহুগুণ সহজ হয়ে যায়।
আইএমএফের ঋণ পাওয়ার আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, দেশীয় ব্যবসায়ীদের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে খরচ হ্রাস পাওয়া। আইএমএফের আস্থা থাকলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় দেশের ব্যাংক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে। ফলে বিদেশি ব্যাংকগুলো তুলনামূলক কম খরচে এবং থার্ড-পার্টি কনফার্মেশন ছাড়াই এলসি বা ঋণপত্র গ্রহণ করে, যা আমদানি-রপ্তানির খরচ কমায়।
এছাড়া আইএমএফের সাথে ঋণচুক্তি থাকলে দেশের বেসরকারি খাতের বড় বড় গ্রুপ বা শিল্পোদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তুলনামূলক কম সুদে বাণিজ্যিক ঋণ পাবেন। অর্থাৎ, আইএমএফের 'সবুজ সংকেত' থাকার অর্থ হচ্ছে দেশের বেসরকারি খাতও বৈশ্বিক বাজার থেকে কম সুদে এবং সহজ শর্তে বায়ার্স ক্রেডিট বা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা পায়।
আইএমএফের শর্ত ও এবারের বাজেট
সদ্য ঘোষিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণ প্রদানে আইএমএফের বেশ কিছু শর্তের স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। এবারের ৯ দশমিক ৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার বাজেটে কর ফাঁকি বন্ধে টিন ও বিন লিংক করা, ব্যাংক খাতের সুশাসনে ‘ব্যাংক রেজোলিউশন ও আমানত সুরক্ষা আইন’ কার্যকর করা এবং বিদ্যুৎ খাতের ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ যৌক্তিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর আর্থিক প্রভাবও আইএমএফ প্রতিনিধিদলের সাথে বৈঠকে মূল্যায়ন করা হবে।
দেশে চলতি বছরের মার্চে রেকর্ড ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন বা ৩৭৫ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে। এছাড়া ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রিজার্ভ দিয়ে দেশের ৫ থেকে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের সাথে নতুন করে ৩ বছরের জন্য একটি ঋণ কর্মসূচীতে যুক্ত হওয়ার অর্থ কেবলই সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার প্রাপ্তি নয়। বরং বৈশ্বিক বাজারে দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার বিষয়ে আস্থা ও বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।