ইলিশের জন্য হাহাকার ভরা মৌসুমেও

ইলিশের ভরা মৌসুমেও রাজধানীর বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ও আকারের মিলছে না ইলিশ। সরবরাহ কম হওয়ায় বাজারে বেড়েছে দামও। এতে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন ইলিশের স্বাদ থেকে। গত বছরের চেয়ে এবার ইলিশের দৈনিক উৎপাদন কমেছে বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর এবং ব্যবসায়ীরা। নদীর নাব্য সংকট, জাটকা ও মা ইলিশের অনিয়ন্ত্রিত নিধন এবং দূষণসহ নানা কারণেই ইলিশের এই সংকট তৈরি হয়েছে বলে মত বিশ্লেষকদের। 

নিষিদ্ধ সময় ছাড়া বছর জুড়েই ইলিশ মাছ আহরণ করে সরবরাহ করা হয় বাজারগুলোতে। তবে জুন থেকে অক্টোবর ইলিশের ভরা মৌসুমেও বাজারের চিত্র ভিন্ন। অন্য বছরের তুলনায় এবার সরবরাহ খুবই কম। 

মৎস গবেষণা ইনিস্টিটিউটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের জেলেরা প্রতি বছর গড়ে সাড়ে পাঁচ লাখ টনের বেশি ইলিশ আহরণ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশ আহরণের যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হবে। 

আড়তদারদের একজন বলেন, সাগরে-গাঙ্গে গিয়েও ট্রলার ফেরত আসছে। আর আমাদের লোকাল নদীতেও নাই ইলিশ। কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ ইলিশ না পেয়ে হতাশ এক জেলে জানান, লাগবে ২০ টন, মাছ হয় ২ মন। কিন্তু ২ মন দিয়েতো আর চাহিদা পূরণ হবে না। তাই মার্কেটে দাম বেশি। 

এখন মৌসুম, কিন্তু আমরা মাছ যা পাওয়ার কথা তা পাই না, বলেন আরেক জেলে। হতাশ আরেক জেলে বলেন, যদিও দুই-একটা পাই, কিন্তু তা ছোট। সেটা বেচতে গেলে আমরা দাম পাই না।

এ প্রসঙ্গে ইলিশ গবেষক আনিছুর রহমান বলেন, একটা ফিজিবিলিটি স্টাডি করা প্রয়োজন যে, এ বিষয়ে কোথায় গ্যাপ আছে। কোনো না কোনো কারণতো আছেই, যেটির কারণে বর্তমান সময়ে বরাবরই ক্রমান্বয়ে (ইলিশ) কম আসা শুরু হয়েছে।

সরবরাহ সংকটের পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম, জ্বালানি তেল, বরফসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের দামের প্রভাব পড়ছে রাজধানীর ইলিশের বাজারে। 

রাজধানীর এক মৎস্য বিক্রেতা জানান, এক কেজি সাইজের ইলিশ মাছ বিক্রি করছি ২৫শ টাকায়, যেগুলো ৯০০ গ্রাম সাইজের সেগুলো বিক্রি করছি ২২শ টাকায়, আর যেগুলো মিডিয়াম সাইজের মাছ, মানে ৩টায় এক কেজি সেগুলো বিক্রি করছি ১২শ টাকা কেজিতে।

ইলিশের উচ্চমূল্যের কারণে হতাশ ক্রেতারাও। এমনই এক ক্রেতা বলেন, ইলিশ খাওয়া খুব কঠিন হয়ে যাচ্ছে। আমার জন্য কঠিন।

নদীর নাব্য সংকট, জাটকা ও মা ইলিশের অনিয়ন্ত্রিত নিধন, দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে মত বিশ্লেষকদের। এর ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কমছে ইলিশের আহরণ। 

মৎস্য বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল ওহাব বলেন, 'আমার কাছে জলবায়ুটাকে প্রধানতম (কারণ) মনে হচ্ছে এ বছর। তাপমাত্রা অনেক বেশি। পানির পরিমাণ অনেক বেশি নয়...ইলিশ কি অন্য কোনো জায়গাতে মাইগ্রেশন করে যাচ্ছে কিনা (সেটা দেখা প্রয়োজন)।'  

বিশ্বের ইলিশ উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে। আহরণের প্রায় ৭৫ শতাংশই হয়ে থাকে এ দেশে।  বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষিত না হলে দেশে থেকে হারিয়ে যাবে রুপালি ইলিশের ঐতিহ্য ও প্রাচুর্য।