হরমুজে বন্ধ, গোপনে তেলের বিশাল কারবার!

হরমুজ বন্ধ—এই খবরেই যখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা, তখন সামনে এলো একেবারে উল্টো চিত্র! অন্ধকারে, ট্র্যাকিং সিস্টেম বন্ধ করে, নীরবে হরমুজ পার হচ্ছে তেলবাহী জাহাজ! বাইরে থেকে মনে হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেলপথ প্রায় অচল। কিন্তু এর আড়ালেই চলছে বিশাল এক গোপন তেল পরিবহন ব্যবস্থা। আর এই গোপন চলাচলই হয়তো এখন পর্যন্ত বিশ্ববাজারকে আরও বড় তেল সংকট থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে রেখেছে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও কুয়েতের তেলবাহী জাহাজ কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে—তবে অনেক জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকায় তাদের অবস্থান প্রকাশ্যে ধরা পড়ছে না। শুধু এসব দেশ নয়, জাহাজ ট্র্যাকিং উপাত্তে ইরাকের তেলও এই পথে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কৌশলটা আরও চমকপ্রদ। অনেক জাহাজ হরমুজের ভেতরে ঢোকা-বের হওয়ার সময় নিজেদের অবস্থান গোপন রাখছে। এরপর পারস্য উপসাগরের বাইরে, ওমান উপসাগরের দিকে অন্য ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে ঠিক কত পরিমাণ তেল এভাবে যাচ্ছে, সেটি নিশ্চিতভাবে হিসাব করা কঠিন। তবে বাজারসংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা, প্রতিদিন গোপনে যাওয়া তেলের পরিমাণ ৪০ লাখ ব্যারেলের চেয়েও বেশি হতে পারে।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল হরমুজ দিয়ে যেত—বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। এখন প্রকাশ্য জাহাজ চলাচল কমে গেলেও এই গোপন পরিবহন, পাইপলাইনের বাড়তি ব্যবহার এবং বিভিন্ন দেশের মজুত তেল বাজারে ছাড়ার কারণে সরবরাহ পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। আর এর প্রভাব পড়ছে দামে।

যুদ্ধ শুরুর পর অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, তেলের দাম ১৫০ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। কিন্তু আগস্টের বড় একটি সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ৮০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে ছিল। অর্থাৎ, হরমুজের আড়ালে চলা এই অদৃশ্য তেল সরবরাহ বিশ্ববাজারে বড় ধাক্কা সামলানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এই পথে ঝুঁকিও ভয়াবহ। ব্লুমবার্গের সূত্র বলছে, এসব জাহাজ হামলার ঝুঁকি নিয়েই চলাচল করছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি জাহাজে হামলা হয়েছে, নাবিক নিহত ও আহত হয়েছেন, এমনকি ওমান উপসাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ার চিহ্নও কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে দেখা গেছে।

বাইরে থেকে হরমুজ যতটা বন্ধ মনে হচ্ছে, বাস্তব চিত্র হয়তো তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। দিনের আলোয় যে হরমুজ প্রায় স্তব্ধ, রাতের অন্ধকারে সেখানেই চলছে কোটি কোটি ডলারের তেলবাণিজ্য। কিন্তু এই গোপন পথ যদি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে, কিংবা জাহাজ চলাচল পুরোপুরি থেমে যায়—তাহলে এতদিন যে তেলের সরবরাহ বিশ্ববাজারকে সামলে রেখেছে, সেটাই হঠাৎ উধাও হয়ে যেতে পারে। আর তখন ৮০–৯০ ডলারের তেল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে—সেটিই হতে পারে হরমুজ সংকটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।